সেনাবাহিনীর পক্ষে আবারও সু চির সাফাই ল

সিলেট নিউজ বিডি ডেস্কঃ জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) হাজির হয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইলেন এক সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানবাধিকারের প্রতীক অং সান সু চি। গতকাল বুধবার দ্য হেগের আদালতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনা রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তার দাবি গাম্বিয়ার আনা রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ ‘অসম্পূর্ণ এবং ঠিক নয়’। রাখাইনে সেনা অভিযানের পেছনে গণহত্যা চালানোর অভিপ্রায়ের কোন প্রমাণ নেই। তার দাবি, রাখাইনের সমস্যাটি আন্তর্জাতিক আদালতে আনার মতো বিষয় নয়। তারপরও সেনারা কোনো যুদ্ধাপরাধ করে থাকলে দেশীয় তদন্ত ও বিচারব্যবস্থায় তাদের বিচার হবে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি তল্লাশি চৌকিতে বিদ্রোহীদের হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নিধন অভিযান চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতনের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এ ঘটনার দুই বছরের বেশি সময় পর গত ১১ নভেম্বর অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) সমর্থনে আইসিজে’তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ দায়ের করে আফ্রিকার ছোট দেশ গাম্বিয়া। এ মামলায় লড়তে গাম্বিয়াকে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করছে বাংলাদেশ, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে এই মিয়ানমারের পক্ষে আদালতে হাজির হয়েছেন দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। গতকাল দ্য হেগের পিস প্যালেসে শুনানির শুরুতেই মিয়ানমারের এজেন্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন সু চি। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের আগস্টের ঘটনাবলী শুরু হয়েছিল যখন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পুলিশ ফাঁড়ির ওপর আক্রমণ চালায়। সেখানে আরসা, আরাকান আর্মির মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনী লড়াই করছে। মুসলমানরা এই সংঘাতের অংশ নয়। সেখানে গণহত্যার ঘটনাও ঘটছে না। বিদ্রোহীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর লড়াইয়ে দুঃখজনকভাবে সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর বহু মানুষকে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হয়তো মাত্রাতিরিক্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করে থাকতে পারে। যদি মিয়ানমারের সেনারা যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করা হবে। তিনি বলেন, রাখাইন প্রদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ।

রাখাইন প্রদেশে গোলযোগের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীর উল্লেখ করে এ সংঘাতকে আরো গভীর করতে পারে এমন কিছু না করতে আইসিজে’র প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সু চি বলেন, গণহত্যা সনদের বিধান রুয়ান্ডা ও সাবেক ইয়োগোস্লাভিয়ায় প্রয়োগ করা হয়নি। গাম্বিয়ার দাবিতে বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। সাধারণ অপরাধকে গণহত্যা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন অভিযোগে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে হয়। কিন্তু, আদালতে তেমন কিছু উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বলেন, গণহত্যা একটি অপরাধ। গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার প্রথম সারিতে রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের সমস্যাটি আন্তর্জাতিক আদালতে আনার মতো বিষয় নয়। সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের দ্রুত বিচার চলছে জানিয়ে সু চি বলেন, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হলে দোষী সেনা সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া থমকে যাবে। আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়ার চেয়ে যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়া সব সময় দ্রুত সম্পন্ন হয়।

তিনি বলেন, মিয়ানমার যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে তা গাম্বিয়ার উপলব্ধি করা উচিত। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লোকজনকে এখন ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ চলছে। সেখানে যে এখন গণহত্যা চলছে না এটাই তা প্রমাণ করে। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া সু চি, এক সময় ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে নন্দিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভূমিকার কারণে সেই তিনিই বিশ্বের বহু দেশের নিন্দা ও ধিক্কারের পাত্র হন। তার আগমন উপলক্ষে দ্য হেগে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। তিনি গতকাল যখন আদালতে প্রবেশ করেন তখন চত্বরের বাইরে তার পক্ষে-বিপক্ষে সমাবেশ হয়।

এই মামলায় মিয়ানমারের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন, দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতামন্ত্রী ট টিন, যুক্তরাজ্যের এসেক্স চেম্বারসের ক্রিস্টোফার স্টকার, মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং মানবাধিকার বিষয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম সাবাস, কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের পাবলিক ইন্টারন্যাশনাল ল’র অধ্যাপক ও কেনিয়ার হাইকোর্টের আইনজীবী মিস ফোবে ওকোয়া, হার্ভার্ডের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক অ্যান্ড্রিয়াস জিমারম্যান এবং যুক্তরাজ্যের এসেক্স চেম্বারসের মিস ক্যাথেরিন ডবসন।

শুনানিতে মিয়ানমারের আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার গাম্বিয়াকে নামমাত্র অভিযোগকারী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আদালতে গাম্বিয়া আবেদন করলেও মূলত আবেদনটি করেছে ওআইসি। মিয়ানমারের ঘটনাবলীতে যদি কোনো দেশ সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে, সেটা হওয়ার কথা বাংলাদেশের। গণহত্যার প্রশ্নে অন্য যেসব দেশ মামলা করেছে, তারা সবাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গাম্বিয়া সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নয়। তিনি বলেন, আদালতকে এই মামলা বিবেচনা করতে হলে বিরোধটি অবশ্যই মিয়ানমার ও গাম্বিয়ার মধ্যে হতে হবে। গাম্বিয়ার অভিযোগ এবং বিরোধ ওআইসির তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশ গণহত্যা সনদের প্রযোজ্য ধারাটি গ্রহণ না করায় কোনো মামলা করার অধিকার রাখে না।

স্টকারের পর আইনজীবী ফোবে ওকোয়া মিয়ানমারের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন। বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চলমান প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়া হলে প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার বাংলাদেশ মিয়ানমারে গণহত্যার ঝুঁকির কথা বলছে না।

আরেক আইনজীবী অধ্যাপক সাবাস বলেন, গণহত্যা সনদের যে ব্যাখ্যা গাম্বিয়া দিয়েছে, তা যথার্থ নয়। জাতিগত শুদ্ধি অভিযান এবং গণহত্যার প্রশ্নে সার্বিয়া বনাম ক্রোয়েশিয়