জুলাই হত্যার দায় স্বীকার মামুনের,গুম-খুনের নির্দেশ দিতেন হাসিনা

সিলেট নিউজ বিডি ডেস্কঃ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সরকারের আদেশে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের আহত ও হত্যা করায় আমি তৎকালীন পুলিশ প্রধান হিসেবে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ যে ব্যাপক নৃশংসতা হয়েছিলো, সেজন্য অপরাধবোধ এবং বিবেকের তাড়নায় আমি ’অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো। ‘র‍্যাব কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, গুম করার নির্দেশনা বা ক্রসফায়ারে হত্যার নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসতো। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীও কিছু কিছু নির্দেশনা দিতেন।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে তিনিও আসামি। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এ মামলায় দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। গতকাল তিনি রাজসাক্ষী হিসেবে এ মামলার ৩৬তম সাক্ষীর জবানবন্দি দেন। তবে সময় স্বল্পতার কারণে তাকে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জেরা করতে পারেননি। মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরা ও পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৩রা সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে মামুন বলেন, ‘আমি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে ১৯৮৬ সালের ২০শে ডিসেম্বর যোগদান করি। বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের দায়িত্ব পালনের পর ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, র‍্যাব’র মহাপরিচালক ও পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমাকে দুইবার চুক্তিভিত্তিক আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আমি মোট ২২ মাস আইজিপি’র দায়িত্ব পালন করি। গত বছরের ৬ই আগস্ট আমার আইজিপি’র চুক্তিটি বাতিল করা হয়। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতি করিনি। তবে আমার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমার বাবা সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলেন। আমার সুনাম এবং সরকারের প্রতি আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুলিশের ডিআইজি, সিআইডি-এর প্রধানসহ র‍্যাব’র মহাপরিচালক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব প্রদান করে।

ডিএমপি’র হাবিব-এসবি’র মনিরের নেতৃত্বে পুলিশের দু’টি গ্রুপ: জবানবন্দিতে সাবেক আইজিপি বলেন, ডিএমপি’র সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও এসবি’র সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীতে দু’টি গ্রুপ গড়ে উঠেছিল। গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ দেখা দেয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আমার সততা, দক্ষতা বিবেচনাক্রমে আইজিপি হিসেবে আমাকে নিয়োগ প্রদান করেন। পুলিশ বাহিনীর সুনাম এবং অফিসারদের মধ্যে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব যাতে দেখা না দেয়, সেজন্য আমাকে পরবর্তীতে দুইবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক মেরূকরণ ও গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক বিভিন্ন বলয় তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিষয় এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েন। সিনিয়র অফিসার হিসেবে আমার মতো পুলিশ কর্মকর্তাদের বাহিনীকে কন্ট্রোল করার সুযোগ সীমিত ছিল। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকায় বিতর্কিত পুলিশ অফিসাররা স্বাভাবিক আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যাপক তৎপর ছিল।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের পর পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাব আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। কিছু পুলিশ অফিসার প্রভাবশালী পুলিশ অফিসার হিসেবে স্বীকৃতি পান। এসব অফিসারের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারাও তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখতেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় রাতের বেলা নিয়মিত বৈঠক হতো, যা গভীর রাত পর্যন্ত চলতো। মন্ত্রীর বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল ডিএমপি কমিশনার হাবিব, ডিবি’র হারুন অর রশীদ, এসবি’র মনিরুল ইসলাম, ডিআইজি নূরুল ইসলাম, বিপ্লব কুমার, এডিশনাল এসপি কাফি, ওসি মাজহার, ওসি ফরমান, ওসি অপূর্ব হাসানসহ আরও বেশ কিছু অফিসারের। এরা কেউই আমি বা আইজিপি’র নির্দেশ সঠিকভাবে মানতেন না। তারা মনে করতেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীসহ সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের কারো কারও ভালো সম্পর্ক ছিল। আইজিপি হিসেবে আমি চাইতাম-পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক।’

তিনি বলেন, পুলিশে গোপালগঞ্জ জেলার অবস্থান বেশ শক্ত। অফিসার ও ওসি পর্যায়ে গোপালগঞ্জ জেলার প্রাধান্য ছিল। তারা সাধারণত কমান্ড মানতেন না এবং নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করতেন। এদের বিষয় সাধারণত দেখতেন তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম ও পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ঢাকার বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে গোপালগঞ্জ জেলার পুলিশ অফিসার ছিলেন। পুলিশের মধ্যে এডিশনাল আইজিপি, তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ও কমিশনার হাবিবের মধ্যে সখ্য ছিল। তারা আলাদাভাবে তাদের লোকজন ও সমমনা পুলিশ অফিসারদের মেইনটেন করতেন। পুলিশ বাহিনীর ইমেজ রক্ষায় ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বকে প্রশমিত করার লক্ষ্যে আমাকে আইজিপি হিসেবে পরবর্তীতে দুইবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা হয়।

জাবেদ পাটোয়ারীর পরামর্শে ২০১৮ সালের রাতের নির্বাচন: চৌধুরী মামুন আরও বলেন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের সময় আমি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী রাতের বেলায় ব্যালট বক্সে প্রায় ৫০%-এর মতো ভোট রাখার পরামর্শ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেন বলে শুনেছি। মাঠ পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে রাতে ব্যালট বক্সে ভোট দেয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা প্রেরণ করা হয়। রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা ও উদ্যোগে জেলা প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ড, এসপি ও থানার ওসিরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে পুলিশের বিপিএম ও পিপিএম পদক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচনসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় পুলিশ অফিসারদেরকে বিবেচনা করা হতো। এক্ষেত্রে সঠিকভাবে পেশাদারিত্ব দেখানো হয়নি।

রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী সরকারের জন্য হুমকি যে কাউকে টিএফআই সেলে আটকে রাখা হতো: ২০২০ সালে র‌্যাব’র মহাপরিচালক হওয়ার পরে পূর্ববর্তী র‌্যাব’র মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের মাধ্যমে জানতে পারি, টিএফআই সেলে ব্যারিস্টার আরমান বন্দি আছেন। আমি মহাপরিচালক হিসেবে যোগদানের পরে র‌্যাব’র ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেমও বিষয়টি আমাকে নিশ্চিত করেন। টিএফআই সেল র‍্যাব’র সদর দপ্তরের অধীনে পরিচালিত হতো। এটির অবস্থান হলো উত্তরার র‍্যাব-১ এর কম্পাউন্ডের ভেতরে। এছাড়াও র‌্যাব’র ইউনিটগুলোর অধীনেও আলাদা আলাদা সেল/বন্দিশালা ছিল। যেগুলো সংশ্লিষ্ট র‌্যাব ইউনিটগুলোর কমান্ডারদের অধীনে পরিচালিত হতো। র‍্যাব কর্তৃক রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা কোনো ব্যক্তিকে তুলে আনা এবং গোপন বন্দিশালায় আটক রাখার বিষয়টি র‍্যাব’র ভেতরে একটা কালচার হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে এই কাজগুলো প্রধানত র‌্যাব (অপারেশন্স) এবং র‍্যাব’র গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকরা সমন্বয় করতেন।
তিনি আরও বলেন, ‘র‍্যাব কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, গুম করার নির্দেশনা বা ক্রসফায়ারে হত্যা করার মতো সিরিয়াস নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসতো বলে শুনেছি। কিছু কিছু নির্দেশনা তৎকালীন নিরাপত্তা ও সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে আসতো বলে জানতে পারি। তিনি বলেন, এডিশনাল এসপি আলেপউদ্দিন ও এসপি মহিউদ্দিন ফারুকী নামের ২ জনকে চিনতাম। তারা র‌্যাব-এ থাকাকালে বন্দিদের অপহরণ নির্যাতন ও হত্যার মতো কাজে পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তীতে র‌্যাব’র এডিজি অপারেশনের প্রস্তাবে আলেপ উদ্দিনকে র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সে নেয়া হয়। তিনি বলেন, র‍্যাব যদিও পুলিশের আইজি’র অধীনে ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মানা হতো না এবং র‍্যাব’র প্রধানরা আইজিপিকে উপেক্ষা করেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশে কাজ করতেন।

সমন্বয়কদের তুলে আনার প্রস্তাবটি ছিল ‘ডিজিএফআইয়ের’,বাস্তবায়নে ছিলেন ডিবির ‘জিন হারুন’: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনের জন্য তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় ১৯শে জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতেই নিয়মিত কোর কমিটির মিটিং হতো। আমি কোর কমিটির সদস্য হিসেবে মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতাম। সেখানে স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর, অতিরিক্ত সচিব রাজনৈতিক টিপু সুলতান, অতিরিক্ত সচিব রেজা মোস্তাফা, তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, র‍্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ, ডিএমপি কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান, বিজিবি’র ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসারের ডিজি মেজর জেনারেল একেএম আমিনুল হক, তৎকালীন এনটিএমসি’র ডিজি মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও ডিজিএফআই প্রধান উপস্থিত থাকতেন। সেখানে আন্দোলন দমন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতো।

তিনি বলেন, ‘কোর কমিটির একটি বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ডিজিএফআই এই প্রস্তাবটি দিলে আমি বিরোধিতা করি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে আমি রাজি হই।

এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ডিজিএফআই এবং তৎকালীন ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে আটক করে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয় এবং সরকারের সঙ্গে আপস করার জন্য মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। তাদের আত্মীয়স্বজনকেও নিয়ে আসা হয়। সমন্বয়কদের আন্দোলন প্রত্যাহার করার জন্য টেলিভিশনে বিবৃতি প্রদানে বাধ্য করা হয়।

তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামালের সঙ্গে ডিবি প্রধান হারুনের গভীর সম্পর্ক ছিল। হারুনকে জিন নামে ডাকতেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি হারুনকে খুব কর্মতৎপর এবং সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিকভাবে খুব কার্যকর মনে করতেন।

র‌্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ এর পরিকল্পনায় ও সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার: আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ড্রোন ও হেলিকপ্টার এর মাধ্যমে আন্দোলনকে নজরদারি, গুলি করা ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়। র‌্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ এর পরিকল্পনায় ও সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার হয়েছিল। আন্দোলন প্রবণ এলাকাতে সরাসরি ল্যাথাল উইপেন ব্যবহার করে আন্দোলন দমন ব্লক রেইড পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আমাকে ফোন করে জানান যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি ল্যাথাল উইপেন ও চাইনিজ রাইফেল ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমি তখন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ছিলাম। আমার সম্মুখে এডিশনাল ডিআইজি প্রলয় জোয়াদ্দার উপস্থিত ছিলেন। আমি তাকে প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার কথা জানালে, তার মাধ্যমে ডিএমপি উক্ত নির্দেশনা জানতে পারেন। পরে ১৮ই জুলাই থেকে ডিএমপি কমিশনার তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সরাসরি ল্যাথাল উইপেন ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও ডিবি প্রধান হারুনুর রশিদ ল্যাথাল উইপেন ব্যবহারে অতি উৎসাহী ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশনা ছিল যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমন করতে হবে।

তিনি বলেন, আন্দোলন দমনে ল্যাথাল উইপেন ব্যবহার করতে প্রধানমন্ত্রীকে ইনসিস্ট করতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র তাপস, সালমান এফ রহমান, ওবায়দুল কাদের, নানক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, মির্জা আজম, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন। এ ছাড়া ড্রোন, হেলিকপ্টার ও ল্যাথাল উইপেন ব্যবহার করে আন্দোলনরত অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়। আওয়ামীপন্থি বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মীরা এবং ব্যবসায়ীরা আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনাকে উৎসাহিত করেন।

আন্দোলন দমনে কাদের ও নানকের উস্কানি: সাবেক আইজিপি বলেন, ১৫ই জুলাই জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ওবায়দুল কাদের বলেন, আন্দোলন দমনে পুলিশ ও ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এর প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরা সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

আন্দোলন দমনে গণ-ভবনে কয়েকটি বৈঠক: ৪ঠা আগস্ট সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গণভবনে নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির একটি বৈঠক হয়। সেখানে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ তিন বাহিনীর প্রধান, এসবি প্রধান, এনএসআই প্রধান, ডিজিএফআই প্রধান ও আমিসহ ২৭ জন উপস্থিত ছিলাম। বৈঠকে আন্দোলন দমন ও নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের রিপোর্ট পেশ করছিল। ইতিমধ্যে চারদিকের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে বৈঠক মুলতবি হয়।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ৪ঠা আগস্ট রাতের বেলা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে গণভবনে বৈঠক ডাকলে আমি যাই। সেখানে আগে থেকে প্রধানমন্ত্রী ও তার বোন শেখ রেহানা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তিন বাহিনীর প্রধান, আইজি হিসেবে আমি, ডিজি র‍্যাব ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব উপস্থিত ছিলেন। ডিজিএফআই প্রধান ও এসবি প্রধান মনিরুল বাহিরে অপেক্ষমাণ ছিলেন। বৈঠকে ৫ই আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে ফোর্স মোতায়েন করে কঠোর অবস্থান নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তিনি বলেন, ৫ই আগস্ট পুলিশ হেডকোয়ার্টারে আমার দপ্তরে যাই। ইতিমধ্যে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও বিভিন্ন পথ দিয়ে স্রোতের মতো ছাত্র-জনতা প্রবেশ করতে থাকে। ঐদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় আমি জানতে পারি প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা ছেড়ে দিবেন। কিন্তু ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি কোথায় যাবেন তা আমরা জানতাম না।

তিনি বলেন, বিকাল বেলা আর্মির হেলিকপ্টার এসে আমাদের পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে হেলিপ্যাডে নিয়ে নামায় এবং পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আর্মির অফিসার্স মেসে নিয়ে যায়। হেলিকপ্টারে ফার্স্ট শিফটে আমার সঙ্গে ছিলেন এসবি প্রধান মনিরুল, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিআইজি আমেনা। দ্বিতীয় শিফটে এডিশনাল ডিআইজি প্রলয় জোয়ারদার এবং এডিশনাল আইজি লুৎফুল কবিরসহ অন্যদের উদ্ধার করে সেখানে নিয়ে আসা হয়। এরপর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানকালীন সময়ে গত বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা: জবানবন্দির এই পর্যায়ে তিনি বলেন, আন্দোলন চলাকালে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে ২৭শে জুলাই আমি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিএমপি কমিশনারসহ আমরা নারায়ণগঞ্জে যাই। সেখানে যাওয়ার পথে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে আমরা কিছুক্ষণ অবস্থান করি। সে সময় ওয়ারি জোনের ডিসি ইকবাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মোবাইলে একটি ভিডিও দেখিয়ে বলে ‘স্যার, গুলি করি একটা, মরেও একটা, বাকিডি যায় না স্যার’।

তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে সরকারের আদেশে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে তাদের আহত-নিহত করায় আমি পুলিশ প্রধান হিসেবে লজ্জিত অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আন্দোলনে যে ব্যাপক নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার জন্য আমি অপরাধবোধ এবং বিবেকের তাড়নায় অ্যাপ্রুভার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ট্রাইব্যুনালে এসে স্বজন হারানোর কান্না, আহাজারি এবং চিকিৎসা প্রদানে বাধা দেয়া সংক্রান্ত ভিকটিম ও ডাক্তারদের বক্তব্য শুনে ও ভিডিও দেখে এবং হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা দেখে অ্যাপ্রুভার হওয়ার সিদ্ধান্তটি আরও যৌক্তিক মনে হয়েছে। বিশেষ করে হত্যা করার পর লাশগুলো একত্রিত করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার বীভৎসতা আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে।

তিনি বলেন, আমি সাড়ে ৩৬ বছর পুলিশে চাকরি করেছি। পুলিশের চাকরি খুবই ট্রিকি কারণ সবসময় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। আমার এই চাকরি জীবনে আমার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ আসেনি। আমি সবসময় যথেষ্ট মানবিকতা ও সচেতনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এত বড় একটি গণহত্যা আমার দায়িত্বকালীন সময়ে সংঘটিত হয়েছে। তার দায় আমি স্বীকার করছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়। আমি গণহত্যার শিকার প্রত্যেকটি পরিবার আহত ব্যক্তিবর্গ দেশবাসী এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমার এই সত্য ও পূর্ণ বর্ণনার মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন হলে আল্লাহ যদি আমাকে আরও হায়াত দান করেন, বাকি জীবনটা কিছুটা হলেও অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাবো।