সালমান আত্নহত্যা করেছেন!

সিলেট নিউজ বিডি ডেস্কঃ সালমান শাহ নামক ধ্রুবতারার দুটি ভিন্ন জগত ছিলো। সিনেমায় তিনি ছিলেন মহা নায়ক,বাস্তবের জমিনে তার ছিল বুক ভরা অভিমান। নব্বই দশকের জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে থাকা অবস্থায় সালমান নিজে আত্নহত্যা করতে পারেন এটা তার ভক্তকুল কখনো কোনদিন মেনে নিতে পারেন নি,পারবেনও না। কিন্তু সালমান দিনকে দিনকে কুড়ে মরছিলেন নিজের অভিমানী মনের মানসিক যাতনায়। পিবি আই হত্যা রহস্যকে আত্নহত্যা বলে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা আমার কাছে সঠিক মনে হচ্ছে! এ বিষয়ে অনেকেই একমত হবেন না, জানি। তবে এর পেছনে যুক্তি আছে।

প্রথমে আসি তার বন্ধুদের দেওয়া জবানিতে। সালমানের বন্ধুরা সবাই এক বাক্যে সালমানের হঠাৎ রেগে যাওয়া,অভিমান করা, আবার রক্ত দিয়ে চিঠি লিখে তাকে ক্ষমা না করলে আত্নহত্যা করবেন বলে হুমকি দেওয়া ইত্যাদি বলতেন বলে তারা জানিয়েছেন । সালমানের এই বন্ধুরা সালমানের সাথে বেশ ক্লোজ ছিলেন। কারন সুপার স্টার হওয়ার পরেও সালমান তাদের কে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছেন, যার সম্পুর্ন খরচ ছিলো সালমানের নিজের। মা বাবার বাইরে একমাত্র কাছের বন্ধুদের পক্ষেই বলা সম্ভব একজন মানুষের সত্যিকারের মনোজগত নিয়ে। বন্ধুদের জবানিতে সালমানের ভিন্ন রুপ খুজে পাওয়া যায়।

মৃত্যুর ২৪ বছরে এর আগে কখনোই সালমানের নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ফ্যান্টাসি নিয়ে কোথাও আলোচনা হয়নি। কেউ কখনো জানতো না সালমান এর আগেও নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। অথচ সালমানের মধ্যে আত্নহত্যার সিনড্রোম ছিল। এ কারনে তিনি ঘুমের ঔষধ ও স্যাভলন খেয়ে আত্নহত্যা করতে চেয়েছিলেন। দুবারই তার ভেতর ওয়াশ করে তাকে বাচাঁনো হয়। সালমান শাহ কেন আত্নহত্যা করবেন এই প্রশ্নের জবাব কিছুটা হলেও মেলে এই দুই ঘটনায়।

সামিরাকে ভালোবেসে গোপনে বিয়ে করেছিলেন সালমান। এ কারনে এই বিয়ে কোনদিন তার মা নীলা চৌধুরী মেনে নিতে পারেননি। বলা বাহুল্য সালমান ছিলেন মা নীলা চৌধুরীর জানের টুকরা। সালমানের হঠাৎ করে সামিরাকে গোপনে বিয়ে করে ফেলা তাকে আবেগগত ভাবে সন্তানকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রনায় একদম শেষ করে দেয়। যে কারনে সামিরাকে কখনো তিনি তার ছেলের ভালো কিছুর ছায়া হিসেবে কোনোদিন ভাবতে পারেন নি। তার কাছে তাই সামিরাই সালমানকে হত্যা করেছে এটা ভাবাই স্বাভাবিক।

অপরদিকে সালমান তার মাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসতেন। কিন্তু বিয়ের পর মা ও বউয়ের দ্বিমুখী ভালোবাসায় কোন পূর্ণতা দিতে না পারায় তার ভেতরটাও শুন্য হয়ে যায়। সামিরার প্রতি স্ত্রী হিসেবে সিম্পেথি কিংবা দায়িত্বের কারনে এক সময় সালমান তার মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। এই আলাদা হয়ে যাওয়াও তার ভেতরটা একদম ধুমরে মুচরে দেয়। মা কেন তাকে আলাদা করে দিলেন এটাই ছিলো সালমানের অভিমানের কারন,তিনি নিজে আলাদা হয়েছেন এটা সালমান কখনো ভাবেননি। যে কারনে মায়ের সাথে দুরত্ব তৈরি হয়ে ভেতরের ভালোবাসা প্রচন্ড আবেগে এক সময় চরম অভিমানে রুপ নেয়।

মা ও স্ত্রীর বাইরে সালমানের জীবনে আসেন আরেক নারী চিত্র নায়িকা শাবনুর। ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী সালমান
কো -আর্টিস্ট শাবনূরের কাছে কিছুটা সুখের সন্ধান পান। বলা বাহুল্য শাবনূর তখন বাংলাদেশের ডাকসাইটের সুন্দরী টপ নায়িকা। দুজনের পরপর অনেকগুলো ছবি হিট হওয়ার পর বাংলাদেশে তাদের যে ফেইম চলে আসে তা সালমানকে আলোড়িত করে। তিনি শাবনুরের সাথে থাকা, একসাথে ছবি করা উপভোগ করা শুরু করেন। এক সময় তার প্রেমে পরে যান।

প্রচন্ড আবেগী সালমানের ম্যানেজিং ক্ষমতা ছিলো খুব লো-লেভেলের। ছোটবেলা থেকে মায়ের আদরে বড় হওয়া সালমান সবখানেই মায়া ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছেন। পরিবার, বন্ধু মহল সব খানেই তার আলাদা একটা আধিক্য, মর্যাদা ছিল; যে কারনে তাকে কখনোই কোন ব্যাপারে খুব বেশি ম্যানেজ করে চলতে হয়নি। কোথাও ঝামেলা হলে তার রক্ত দিয়ে চিঠি লেখাই প্রমান করে তার সারল্য সহজীয়া মনের গল্প। তিন নারীর টান সামলে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে চলার ম্যানেজিং তাই সালমানকে দিয়ে হয়নি।

বিয়ের বহু বছরেও নিজের কোন সন্তান না হওয়া সালমানের মনোজগতে আঘাত হানছিলো। যেহেতু ডাক্তাররা বলেছিলেন বাচ্চা ধারনে সামিরার কোন সমস্যা নেই অর্থ্যাৎ সমস্যা আছে সালমানের। এটা নিয়েও সালমানের মানসিক অপুর্নতার যন্ত্রণা ছিলো। সালমান সামিরার প্রতিনিয়ত ঝগড়ার এটাও একটা কারন। মৃত্যর আগের রাতে শাবনুরকে কেন্দ্র করে হওয়ায় ঝগড়ায় সামিরা সালমানকে তার পুরুষত্ব নিয়ে এমন কিছু বলেছিলেন যা তাকে আত্নহত্যায় প্ররোচনা জুগিয়েছে। সামিরা এই বিষয়টি নিয়ে না বললেও মাতৃত্বের তাড়নায় থাকা একজন স্ত্রীর পক্ষে এমন কিছু বলা অসম্ভব কিছু নয়,যেখানে স্বামী পরকীয়ায় আসক্ত,অন্য মেয়ের প্রেমে মজে আছেন।

প্রিয় মায়ের দুরে ঠেলে দেওয়া, সামিরার কাছে পুরুষ হিসেবে অক্ষমতা সালমানকে নিয়ে আসে শাবনুরের আরো কাছে। কিন্তু তিনের গোজামিলে তিনি কাউকেই ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। ওই যে তার ম্যানেজ করার ক্ষমতা ছিলোনা। ফলে দিনে দিনে বাড়ছিলো দুর্ভোগ।

সামিরা প্রেম পিয়াসী ছবির ডাবিং সেটে আসবেন শুনেও সালমান শাবনুরের সাথে বেশ ঘনিষ্ট ভাবেই বসে ছিলেন,এর কারন শাবনুরের প্রেমে সালমান একদম মজে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে তার স্ত্রী সামিরার রিয়্যাকশান দেখে তার বোধদয় হয়। তিনি স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বের ব্যাপারে অনুশোচনা বোধ করেন।

সালমান শাবনুরকে বিয়ে করে দুই বউ নিয়ে কখনোই সংসার করতেন না। নব্বই দশকের তার মত একজন নায়ক এমন ঘটনা করলে তখনকার সমাজ তাকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতো। সালমানের সেই জ্ঞান ছিলো। মায়ের প্রতি অভিমান,ভালোবাসার স্ত্রীর সাথে নিত্য ঝগড়া এবং প্রেয়সী শাবনুরকে কখনোই না পাবার হতাশা ও এই ত্রিমুখী গোজামিল সালমানকে বড় একটি সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।

এমন একটা কিছু যা এই তিনজন মানুষকে প্রবলভাবে আঘাত করবে। সে কারনেই সালমান মৃত্যুর আগের দিন পালিত পুত্র ওমরের মাকে বলেন “কাল এখানে অনেক মানুষ আসবে,তোমার ছেলে অনেক বিখ্যাত হবে, সবার সামনে তুমি ওকে নিয়ে যেও”।

সে সময় সালমানের প্রতি মানুষের ক্রেজ সালমানকে এক ফ্যান্টাসি জগতে নিয়ে গিয়েছিলো। তাই তিনি নিজেকে মেরে চিরকালের জন্য রহস্যাবৃত এক ফ্যান্টাসি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

একজন সফল মানুষ কেন নিজেকে মেরে ফেলবেন সেটাই ছিলো ভক্তদের প্রশ্ন। আদতে তিন নারীর ভালোবাসা রাখতে পারা না পারার দ্বন্ধে সালমান নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যাতে সফলতা অসফলতার কোন প্রশ্ন আসেনা।

মৃত্যুর আগের রাত থেকে সালমান তার নিজের বাসায় ছিলেন। ওই সময়কার সব স্বাক্ষী প্রায় একই রকম জবানবন্দি দিয়েছেন যে সামিরা তালা খুলে ড্রেসিংরুমে সালমানের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। এই মানুষগুলো সালমানের বাসায় কাজ করতেন,সালমানের সাথে কাজ করতেন, সালমানই তাদের কাছে অধিক প্রিয় হওয়ার কথা। সামিরার পক্ষে মেরে ফেলে তাদের দিয়ে গল্প সাজানোর কোন ক্ষমতা ছিলোনা, কারন সালমান সারা দেশের মানুষের কাছে ছিলেন ভালোবাসার কান্ডারি। আর যেখানে এইসব সাধারণ মানুষ তার খুব কাছে থাকতেন তাদের নিত্য দিনের গল্প ভালোবাসা ছিলো সালমানকে ঘিরে। বরঞ্চ পরিকল্পিত ভাবে সালমান কাউকে মেরে ফেললে তাদের সহযোগিতা করার কথা,সামিরা নয়। সে কারনে তাদের সবার জবানবন্দি এক সুতোয় গাথা।

সালমানের বাসায় আগের রাতে বা ওইদিন সকালে বাইরের কোন মানুষ বাইরে থেকে তার ফ্ল্যাটে আসেননি। কোন খুনির পক্ষে বাইরে থেকে এসে সালমানকে হত্যা করা সম্ভব নয় কারন ওই ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি ছিলো খুব কড়া। তখনকার সময়ে বলা চলে ফ্ল্যাটবাড়ির সুযোগ সুবিধা ছিলো এখনকার মতই আধুনিক।

তবে বাইরে থেকে কেউ না আসলেও ওই বিল্ডিংয়ের কোন এক ফ্ল্যাটে এক বা একাধিক আততায়ী অবস্থান নিয়ে ডোর টু ডোর এসে সালমানকে হত্যা করে যেতে পারেন, যা পিবিয়াই খতিয়ে দেখেছে কিনা আমার জানা নেই।

সুখ অসুখ মান অভিমান হতাশা নিরাশার দোলাচলে সালমানকে নিজেকে শেষ করে একটা ফ্যান্টাসি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য শিশুমনের সালমান তা করেও গেছেন।

একজন পাড় ভক্ত হিসেবে সালমান আত্নহত্যা করেছেন তা কখনো কোনদিন মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমি মনে করি সালমানের হত্যা নাকি আত্নহত্যার ব্যাপারে সবচেয়ে ক্লোজ সমাধানটা পিবিআই দিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার সবচেয়ে কাছাকাছি ফলাফলটাই তারা দিতে পেরেছেন। মেনে নিতে না পারলেও আপাত দৃষ্টিতে এই ফলাফলকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আর যদি অতিলৌকিক কিছু বলতে হয় তাহলে বলি…
সালমান নব্বই দশকে এসেছিলেন ত্রিশ বছর পরের পৃথিবী থেকে! আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তার স্টাইল গেটাপ লুক ছিলো যার স্বাক্ষী। তখনকার সময়ে তার পোশাক পরিচ্ছদ স্টাইল ছিল এত বেশি আধুনিক ছিলো যে তা সত্যিকার অর্থেই বিস্ময়াভুত করে।

কিংবা সালমানকে বলা চলে তিনি ছিলেন “এলিয়েন”। যিনি ভবিষৎ পৃথিবী থেকে এসে আলো ছড়িয়ে আবার খুব অল্প সময়ে ফিরে গেছেন দুরান্তে। এমন সম্ভাব্যতায় হয়ত আবার তাকে কোন একদিন ফিরে আসতে হবে পৃথিবীতে। অন্য কোন নামে,অন্য কোন পরিচয়ে।

ভালোবাসি সালমান শাহ। তুমি বেচেঁ আছো আমাদের অন্তরে।

লেখকঃ
সাংবাদিক হাসান মো. শামীম