রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না, তার ‘প্রমাণ’ দিয়ে এই প্রকল্প সরানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করে একদল পরিবেশবাদী এবং বাম দলের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর শনিবার(২৭আগষ্ট) এনিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সরকার প্রধান।
গণভবনে বিকালে এই সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর স্বাগত বক্তব্যের পর পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন একটি ‘পাওয়ার পয়েন্ট’ উপস্থাপনা দেন।
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নজির দেখানোর পাশাপাশি সুন্দরবনে যে কোনো দূষণ এড়াতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। এরপর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গুরুত্ব তুলে ধরে একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
এরপর প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে বলেন, “দেশের উন্নয়নের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য যা কিছু ভালো মনে হবে, আমি সেগুলো করবই।
“আপনারা আমার উপর বিশ্বাস রাখুন। আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আমি এমন কোনো কাজ আগেও করিনি, ভবিষ্যতেও করব না, যা দেশের এবং দেশের মানুষের সামান্যতম ক্ষতি করে।”
ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপালে ১৩শ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, যা বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকিতে ঠেলে দেবে দাবি করে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে বাম দলগুলো।
এরপর খালেদা জিয়া গত ২৪ অগাস্ট সংবাদ সম্মেলনে রামপাল প্রকল্পটিকে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যায়িত করে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবনের কাছ থেকে অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
ওই সংবাদ সম্মেলনের দিকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, “অবশেষে থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। এতদিন অন্তরালে থেকে ইন্ধন জোগালেও ওই দিন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রেস কনফারেন্স করে এই অপপ্রচারে প্রকাশ্যে সামিল হয়েছেন।
“আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, হঠাৎ করে বিএনপির এই অপপ্রচারে প্রকাশ্যে যোগ দেওয়ার পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে যদি কোনো নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই থাকত, তাহলে তারা অনেক আগেই তা জনসম্মুখে প্রকাশ করত।”
এতদিন ধরে আন্দোলন চালানোর পেছনে বিএনপির ‘খোঁটার জোর’ ছিল বলেও মনে করেন শেখ হাসিনা।
এতদিন ধরে আন্দোলন চালানোর পেছনে বিএনপির ‘খোঁটার জোর’ ছিল বলেও মনে করেন শেখ হাসিনা।
আন্দোলনে অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, “এই যে শত শত মানুষ জড় করে রোডমার্চ করে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ফুয়েল লাগে, উনারা ফুয়েল কোথা থেকে পাচ্ছেন?
বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের সঙ্কট দেখা দেওয়ায় মূল্য এবং প্রাপ্যতার দিক থেকে কয়লা এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন, জাপান, ভারত তাদের মোট বিদ্যুতের ৪০ থেকে ৯৮ শতাংশ উৎপাদন করে কয়লা দিয়ে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে কয়লা বিদ্যুতের পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশের সামান্য বেশি।
বাংলাদেশের অব্যাহত বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং যৌক্তিক মূল্যে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর জন্য রামপালে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণের কথা বলেন তিনি।
“রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে দেশের উন্নয়নবিরোধী একটি মহল বেশ কিছুদিন যাবত ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও মনগড়া বক্তব্য এবং তথ্য দিয়ে এ প্রকল্প সম্পর্কে মানুষের মনে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব এবং ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করে আসছে।”
রামপালে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতাকারীরা মূল বক্তব্য হচ্ছে, এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গরান বন সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি আপনাদের সামনে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে প্রমাণ করে দিব, বাস্তবায়নাধীন রামপাল-বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না।”
আন্তর্জাতিকভাবে গভীর বনভূমির ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার আইন থাকার কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের প্রান্ত সীমানা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হতে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।”
এই এলাকার বায়ুপ্রবাহ সুন্দরবনের বিপরীত দিকে- এই তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “সামান্য পরিমাণ ক্ষতিকারক বায়বীয় পদার্থও যদি নিঃসরণ হয়, তবে তা সুন্দরবনের দিকে নয়, উল্টোদিকে প্রবাহিত হবে।”
খালেদা জিয়া তার পুরো বক্তব্যে ‘উদ্ভট, বানোয়াট এবং অসত্য’ উপাত্ত পরিবেশন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
খালেদা জিয়া তার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করবে।
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “এ কথা মোটেই সত্য নয়। বরং, এটি নির্মিত হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।”
সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষের চুরি করে গাছ কাটার প্রয়োজন আর হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, “কোম্পানি থেকে বছরে ৩০ কোটি টাকা সিএসআর ফান্ডে জমা হবে। তা দিয়ে এলাকার জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কাজ করা হবে। লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হবে।”
খালেদা জিয়া: ১ হাজার ৮৩৪ একর জমির উপর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপিত হবে।
শেখ হাসিনা: আসলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জায়গা নেওয়া হয়েছে ৯১৫ একর। এর মধ্যে ৪৬৫ একরে মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে। বাদবাকি জায়গায় সোলার প্যানেল বসবে এবং সবুজায়ন করা হবে।
খালেদা জিয়া: যে স্থানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৮২ জন। আট হাজারের বেশি মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। জমি তিন ফসলী।
শেখ হাসিনা: প্রকৃতপক্ষে এলাকাটিতে মানুষের কোনো স্থায়ী বসতি ছিল না। কোনো বসতি উচ্ছেদ করা হয়নি। নিচু, পতিত জমি মাটিভরাট করে উঁচু করা হয়েছে।
খালেদা জিয়া: রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পশুর নদী থেকে প্রতি ঘণ্টায় ১৪৪ কিউসেক পানি নেওয়া হবে। ব্যবহারের পর সেই পানি নাকি পরিবশে দূষণ করবে।
শেখ হাসিনা: পশুর নদীর পানিতে লবণ আছে। সেই পানি শোধন করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে। ব্যবহৃত পানি শীতল করে পুনরায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে। কোনো দূষিত বা গরম পানি পশুর নদীতে ফেলা হবে না। যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হবে তা অত্যন্ত নগণ্য। শুষ্ক মওসুমে পশুর নদীর প্রবাহের মাত্র দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ভাগের এক ভাগ পানির প্রয়োজন হবে। এই পশুর নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত ড্রেজিং করা হবে। পানি চলাচল বাড়বে। নাব্যতা বৃদ্ধি পেলে মংলা বন্দরে নৌযান চলাচল বৃদ্ধি পাবে। আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
খালেদা জিয়া: ভারতে বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আইনি বাধা রয়েছে।
শেখ হাসিনা: ভারত একটি বিশাল আয়তনের দেশ। বাংলাদেশের মতো্ ঘনবসতিপূর্ণ দেশের সঙ্গে তুলনা সঠিক নয়।
খালেদা জিয়া: কয়লা পরিবহনের সময় সুন্দরবন এলাকায় শব্দ দূষণ এবং আলো দূষণ হবে।
শেখ হাসিনা: শব্দ ও আলো দূষণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। গভীর সমুদ্র হতে কভার্ড বার্জে কয়লা পরিবহন করা হবে। বার্জে ব্যবহৃত হবে ঢাকনাযুক্ত কম শব্দযুক্ত ইঞ্জিন। ফলে পরিবেশ দূষণের কোনো সম্ভাবনা নেই। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শব্দ দুষণ নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা থাকবে। ১৪ কিলোমিটার দূরে শব্দ যাবে না। ২০০ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের কথাও বলেছিলেন খালেদা জিয়া, যার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “কিন্তু কত সংখ্যক কয়লাভিত্তিক প্ল্যান্ট চালু আছে, তা কি তার জানা আছে?
“যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে কয়লা থেকে। সেখানে ৭ হাজারের বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু আছে।”
রামপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম আট দশমিক ৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ অসত্য কথন’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে কয়লার দামের উপর ভিত্তি করে।
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
Sylhetnewsbd Online News Paper