সাধু খেতাবধারী হতে যাচ্ছেন ‘মাদার তেরেসা’

মাদার তেরেসা। বিশ্বময় মানবতার জানান দিতে একটি নামই যথেষ্ঠ। যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সারাবিশ্বের দুস্থ মানুষের ভরসা ও মমতাময়ী মায়ের প্রতিমুর্তি। যাঁর আসল নাম ছিল আনিয়েজ গঞ্জে বয়াজিউ। আর ডাক নাম ছিল অ্যাগনেস। সেই অ্যাগনেস থেকে ধাপে ধাপে মাদার তেরেসা হয়েছেন তিনি।

যিনি সুদীর্ঘ ৪৫ বছর বিলিন করে দিয়েছেন দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায়। একান্ত মায়ের স্নেহ-মমতায় বুকে তুলে নিতেন দুঃখী ও দুস্থ মানুষকে। তাকে আর কী বলা যেতে পারে? তিনি তো সাধুই।

মানবতাবাদী অবস্থান ও সৎ গুণাবলীই তাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলেছে।

তিনি দখল করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়। আনুষ্ঠানিকভাবে খ্রিস্টধর্মের সেইন্ট (সাধু) খেতাবধারী হতে যাচ্ছেন এ মহিয়সী নারী। রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ ফ্র্যান্সিস এদিন তার ক্যানোনাইজেশন (চার্চের পক্ষ থেকে সেইন্ট ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতা) সম্পন্নের পরই এ স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছেন তিনি।

কর্ম দিয়ে যে পৌঁছে যেতে পারে মানুষের মন মঞ্জিলে তার আবার আনুষ্ঠানিক খেতাবের প্রয়োজন কি?

১৯৭৯ সালে মানবতার সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ শান্তির জন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয় তাকে। পুরষ্কারের ১৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য পুরস্কারের প্রায় এক কোটি টাকা সবই তিনি দান করেন মানবতার সেবায়। প্রমাণ করেছেন কোনো খেতাব বা পুরষ্কারের জন্য অপেক্ষা করেন না তিনি।

তেরেসার ভাবমূর্তি এমনিতেই সেইন্টসুলভ। সেক্ষেত্রে চার্চের ঘোষণাকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা বললেও খুব একটা ভুল হবেনা।

তবে আজকের এই মর্যাদাময় আসনে এক লাফে উঠে আসেননি মাদার তেরেসা। ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন তিনি। মেসিডোনিয়ার স্কোপি শহরে ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মমতাময়ী মা।

১৯১৯ সালে মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা তাঁকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে লালন-পালন করেন। জোয়ান গ্র্যাফ ক্লুকাস রচিত জীবনী থেকে জানা যায়, ছোট্ট অ্যাগনেস মিশনারিদের জীবন ও কাজকর্মের গল্প শুনতে বড়োই ভালবাসতেন। ১২ বছর বয়সেই তিনি ধর্মীয় জীবন যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে মিশনারীর সেবাব্রত নিয়ে ভারতের কলকাতায় আসেন এবং যোগ দেন সিস্টার্স অফ লোরেটো সংস্থায়।

১৯২৮ সালে ‘নান’ হন, নাম হয় সিস্টার টেরিজা। ১৯৩৭ সালের ২৪ মে তিনি ‘মাদার’ হন। ১৯৩১ সালের ২৪ মে তিনি সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি মিশনারিদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত এর নামানুসারে টেরিজা নাম গ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালের ১৪ মে পূর্ব কলকাতায় একটি লোরেটো কনভেন্ট স্কুলে পড়ানোর সময় তিনি চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন। স্কুলে পড়াতে তাঁর ভাল লাগলেও কলকাতার দারিদ্র্যে তিনি উত্তরোত্তর উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলেন।

সিস্টার তেরেসা থেকে ধাপে ধাপে সেইন্ট তেরেসা হওয়ার গল্প নিচে তুলে ধরা হলো:

ঈশ্বরের সেবক:
একটি ডায়োসেস-এর (ক্যাথলিক চার্চের স্থানীয় প্রশাসন) বিশপের কাছে ভক্তরা আবেদন জানান যে, কোনও ব্যক্তি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তাঁকে সন্ত করার কথা বিবেচনা করা হোক। বিশপ অনুমতি দিলে সেই ব্যক্তির লেখাপত্র, বক্তৃতা, উপদেশ ইত্যাদি সন্ধান করে একটি বিশদ জীবনী লেখা হয় এবং তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার সাক্ষীদের বয়ান সংগ্রহ করা হয়। এই পর্যায়ে ওই ব্যক্তিকে বলা হয় ‘সারভ্যান্ট অব গড’ বা ঈশ্বরের সেবক।

প্রাথমিক ভিত:
সমস্ত তথ্যপ্রমাণ দাখিল করা হয় এক জন ‘পস্ট্যুলেটর’-এর কাছে। তিনি সংশ্লিষ্ট ‘ঈশ্বরের সেবক’ সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করে সব কিছু বিবেচনা করে সন্তুষ্ট হলে সন্তায়ন প্রক্রিয়ার একটা ‘পস্ট্যুলেট’ বা প্রাথমিক ভিত তৈরি করেন।

মহিমময়:
পস্ট্যুলেটের ভিত্তিতে পোপের কাছে সুপারিশ করা হয় যে, তিনি ঈশ্বরের সেবক-এর মহিমার কথা ঘোষণা করুন। পোপ সেই ঘোষণা করলে ঈশ্বরের সেবক ‘ভেনারেবল’ বা মহিমময় আখ্যায় পরিচিত হন।

আশীর্বাদপ্রাপ্ত:
একটি বৈজ্ঞানিক কমিশন এবং একটি থিয়োলজিকাল কমিশন ‘ভেনারেবল’ মানুষটির সম্পাদিত অন্তত একটি ‘মিরাক্ল’ বা অলৌকিক কীর্তির সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে সেটিকে অলৌকিক বলে স্বীকার করলে পোপের কাছে সেই সিদ্ধান্ত পাঠানো হয়। পোপ যদি মনে করেন, এ সবই সত্যি, তা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ‘বিয়েটিফিকেশন’ ঘোষণা করেন। এই কথাটির অর্থ: চার্চ এটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করে যে, ওই ব্যক্তির পাপমুক্তি হয়েছে। তিনি ‘ব্লেসেড’ বা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়ে স্বর্গে প্রবেশ করেছেন।

দ্বিতীয় অলৌকিক:
এই পদ্ধতিতে সন্তায়নের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি দ্বিতীয় অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং সেখানে পোপের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

১৯৯৯-২০১৬:
সন্ত হওয়ার যোগ্য কোনও ব্যক্তির সন্তায়নের প্রক্রিয়াটি সচরাচর শুরু হয় তাঁর মৃত্যুর অন্তত ৫ বছর পরে। মাদার টেরিজার ক্ষেত্রে পোপ দ্বিতীয় জন পল এই নিয়ম শিথিল করেন। মাদার প্রয়াত হন ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। ১৯৯৯ সালে পোপ তাঁর সন্তায়নের পদ্ধতি শুরু করার অনুমতি দেন।