বদরুলের ‘চাপাতির’ কাছে নির্বাক এমসি কলেজ

সেদিন বিকেলের এমসি কলেজ ছিলো নির্বাক, একজন বদরুল ও একটা ‘চাপাতির’ কাছে পরাস্ত হয় দৌড়ে পালায় উপস্থিত ছাত্র ছাত্রীসহ লোকগুলো। সিনেমার দর্শকের মতো দাড়িয়ে থাকা লোকগুলোর মধ্যে কেউ ছবি, কেউ ভিডিও করতে থাকেন। খাদিজার পাশে যাওয়ার মতো কোন মানুষই তখন সেখানে ছিলনা।

সোমবার (৩ অক্টোবর) সিলেট এমসি কলেজ পুকুর পাড়ে প্রকাশ্যে খাদিজা বেগম নার্গিসকে প্রাণে হত্যার চেষ্টা করে বদরুল আলম। ক্যাস্পাসের ভেতরে ঢুকে জনতার সামনে তার হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে খাদিজার মাতায় একটার পর একটা কুপে দিয়ে রক্তের হুলি খেলায় মেতে উঠে নরপিশাচ বদরুল।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বদরুল আলম। শাবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের সে সিনিয়র সহ-সম্পাদক। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত মনিরগাতি গ্রামে। ওই গ্রামের মৃত সৈয়দুর রহমানের ছেলে সে। তার বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। জাঙ্গাইলে দুর্বৃত্তদের হামলার পর ছাত্রলীগের পদ জুটে বদরুলের। এরপর থেকেই বদরুলের বেপরোয়া ভাব বেড়ে চলে। শেষ পর্যন্ত এটি গিয়ে ঠেকে ‘চাপাতি’ ঘটনায়।

জানা যায়, চার ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সে। চার বছর আগে তার বাবার মৃত্যু হয়। টানাপোড়েন সংসারের হাল ধরে রেখেছেন দর্জি দোকানি বড়ভাই। বদরুলের বৃদ্ধ মা সন্তানের অপকর্মের খবর শুনে শয্যাশায়ী। কোনও কথা না বলে নীরবে কেঁদে চলছেন। তার এমন আমানুষিক কাজে কোনও যুক্তি দাঁড় করাতে পারছে না পরিবারের লোকজন।
বদরুল একসময় শিবিরের আদর্শে উজ্জ্বীবিত ছিল বলে অভিযোগ করেছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক এক সদস্য।

তিনি জানান, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে বদরুল খাদিজাদের বাসায় লজিং থেকে পড়াশোনা করতো। খাদিজাকেও সে পড়াতো। ওইসময় থেকেই সে খাদিজাকে বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করতো। বারবার প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পরও প্রত্যাখ্যাত হয় খাদিজা আক্তার নার্গিসের কাছে। এরপরও সে পিছু ছাড়েনি। তার বিরক্ত করার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। একটা সময় খাদিজার স্বজনরা বদরুলকে মারধোর করে অপমান করে লজিং থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর সে প্রায়ই খাদিজার সেলফোনে, তার পরিবারের সেলফোনে কল দিয়ে বিরক্ত করতো। গালমন্দ করতো।

এঘটনায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিস্কার করেছে শাবি প্রশাসন। এবং দেশের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জানিয়েছে সে ‘ছাত্রলীগের’ কেউ নয়। এমনকি ছাত্রলীগ খাদিজার পাশে আছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের কেন্দ্রিয় নির্বাহী কমিটির সাধারন সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পুলিশের সূত্র অনুযায়ী প্রেম ঘটিত কারনে খাদিজাকে হত্যা চেষ্টা করে বদরুল। অন্যদিকে খাদিজার মামা আব্দুল বাসিত জানান, খবরের কাগজে এই ছেলের সঙ্গে খাদিজার প্রেমের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা একেবারেই ঠিক নয়। ছেলেটি তাকে বিরক্ত করতো কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ও তো কখনও কিছু বলে নাই, ওর মায়ের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে আমার। সেও কিছু জানে না।’

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম। অসংখ্য চাপাতির কোপের আঘাত রয়েছে তার মাথা ও দুই হাতে। স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকরা মঙ্গলবার এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, খাদিজা এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন।

হাসপাতালের মেডিসিন অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের কনসালট্যান্ট এবং হাসপাতালের অ্যাসোসিয়েট মেডিক্যাল ডিরেক্টর ড. মির্জা নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘খাদিজার মাথায় অসংখ্য চাপাতির কোপের চিহ্ন রয়েছে। তাকে এমনভাবে কোপানো হয়েছে যে, খুলি ভেদ করে ব্রেইন ইনজুরি হয়েছে। কোপানোর সময় হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করায় তার দুই হাতের রগ কেটে গেছে।