দেশের যেসব তরুণ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে আর্থিক অনুদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে ঘোষণা করেছিল সরকার। সেই মতে, বুধবার বগুড়ায় দুই ‘জঙ্গি’ আত্মসমর্পণ করলে তাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয়া হয় পাঁচ লাখ টাকার চেক।
আত্মসমর্পণের সময় দুই ‘জঙ্গি’ আব্দুল হাকিম (২২) ও মাহমুদুল হাসান বিজয় (১৭) জানান, ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অন্ধকার জগতে নেয়া হয়েছিল তাদের। গুলশানের আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার হামলার ঘটনা টিভিতে দেখে তাদের ভুল ভাঙে। তারা জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
বগুড়ার টিটু মিলনায়তনে বুধবার অনুষ্ঠিত হয় আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অনুদানের চেক তুলে দেন ফিরে আসা দুজনের হাতে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বগুড়া-১২ আয়োজিত জঙ্গিবাদবিরোধী ওই সুধী সামাবেশ এবং জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজির আহমেদ, স্থানীয় পুলিশ সুপার, জনপ্রতিনিধিসহ সুধীজনরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে জঙ্গিবাদমুক্ত করতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে। আইশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি জঙ্গিদের আত্মসমর্পণেরও সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে একটিও হত্যাকান্ড- চান না। সে জন্য তিনি জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের পুনবার্সনের জন্য আর্থিক অনুদানও ঘোষণা করেছেন।
জঙ্গি পথ থেকে ফিরে এসে অনুদান পাওয়া আব্দুল হাকিম ও মাহমুদুল হাসান বিজয় তাদের জঙ্গিবাদে জড়ানো ও ফিরে আসার বর্ণনা দেন অনুষ্ঠানে।
হাকিম ও বিজয়ের ভাষ্য, ‘আমাদের ভুল বোঝানো হয়েছিল। ইসলামের অপব্যাখ্যার শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। সেই ভুল শিক্ষা আমাদের অন্ধকার গলির শেষ সীমানায় নিয়ে যায়। আমরা জড়িয়ে পড়ি জঙ্গিপনায়। রাতের আঁধারে, গোপনে নিভৃতে মানুষ মারার কৌশল আয়ত্ত করি। আমাদের কাছের বন্ধুরা সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছে। আমরাও সেই পর্যায়ে যাওয়ার পরীক্ষা দিয়েছিলাম। নেতারা আমাদের পরীক্ষায় ফেল করে দেন। আবারও চেষ্টা করি। কোরানের আয়াত মুখস্থ করি। পরিবার থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তাগিদ আসতে থাকে ওপর থেকে। শেষ পর্যন্ত পরিবার ছাড়তে পারিনি। এর মধ্যে হলি আর্টিজন ও শোলাকিয়া হত্যাকা-ের বীভৎসতা টেলিভিশনে দেখে অন্তরে ব্যথা পাই। ভুল ভেঙে যায়।’
তারা আরো বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারি আমাদের পথ অকল্যাণের। অপরাধের। পরিবারের সদস্যদের ফিরে আসার কথা বলি। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করে। আমরা আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমরা স্বাভাবিক জীবনের ফিরে আসতে আপনাদের সহযোগিতা চাই।’
আত্মসমর্পণ করা আব্দুল হাকিম ছিলেন গুলশানের হলি আর্টিজন রেস্তোরাঁয় নিহত জঙ্গি পায়েলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পায়েলের হাত ধরেই জঙ্গিপনায় পা বাড়িয়েছিলেন হাকিম।
বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুল হাকিম ছোটবেলায় ব্র্যাক স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১৩ সালে দাখিল এবং ২০১৫ সালে আলিম পাস করে। এরপর পরিচয় হয় হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় নিহত জঙ্গি খায়রুল ইসলাম পায়েলের সঙ্গে। তার কথামতো হাকিমও পা বাড়ান জঙ্গি আস্তানায়। এরপর স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেন তিনি। একপর্যায়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করতে না পেরে ফিরে আসেন। প্রস্তুতি নেন আবার পরীক্ষার। এর মধ্যে ঘটে গুলশান ও শোলাকিয়ার হত্যাকা-। এতে তার ভুল ভাঙে। ফিরে আসার পথ খোঁজেন পরিবার ও আইশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে।
মাহমুদুল হাসান বিজয় গাইবান্ধা জেলার হাটভরতখালী গ্রামের মৃত সেকেন্দার আলীর ছেলে। গ্রামের একজন সাধারণ পরিবারের ছেলে বিজয় শিক্ষাজীবনের শুরুতে মাদ্রাসা ও সাধারণ দুই শাখাতেই পড়াশোনা করে। সে মুফতি জসীম উদ্দিন রহমানীয়ার ওয়াজ এবং বই পড়ে জেএমবিতে যোগ দেয়। পরে তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেয় এবং অস্ত্র চালনা পরীক্ষায় পাস করে। মাহমুদুল গাইবান্ধার বোনারপাড়া, বগুড়ার সারিয়াকান্দিসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত জেএমবির প্রোগ্রামে উপস্থিত হতো।
তবে তারা কেউ কোনো হামলায় অংশ নেয়নি বলে জানায়।
Sylhetnewsbd Online News Paper