‘ইন্ডাস্ট্রি কারো একার নয়, এখানে সবাই কাজ করবে’

সিলেট নিউজ বিডি ডেস্ক: দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া চলচ্চিত্রের মানুষদের জেগে ওঠার আন্দোলনকে ঘিরে আবারো চলচ্চিত্রে সরব রিয়াজ। যৌথ প্রযোজনার অনিয়ম ও সাফটা চুক্তির আড়ালে কলকাতার ছবি দিয়ে ঢাকার বাজার সয়লাব করার ষড়যন্ত্র রুখতে আন্দোলনে নেমেছে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চলচ্চিত্র ঐক্যজোট। এর আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঢাকাই ছবির মিয়াভাই খ্যাত অভিনেতা ফারুক।

সঙ্গে আছেন প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরু, পরিচালক সমিতির নেতা মুশফিকুর রহমান গুলজার, বদিউল আলম খোকন, শিল্পী সমিতির নেতা মিশা সওদাগর, জায়েদ খানসহ আরো অনেকেই। আর শিল্পী সমিতির সহ-সভাপতি হিসেবে এই আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা রেখে চলেছেন অভিনেতা রিয়াজ।

অবশেষে আন্দোলনের মুখে তথ্য মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়েছে অনিয়মের যৌথ প্রযোজনা বন্ধ করাসহ চলচ্চিত্র পরিবারের বেশ কিছু দাবি মেনে নিতে, যা সার্বিক চলচ্চিত্রের জন্যই ইতিবাচক। ৯ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ মন্ত্রণালয়ের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও চলচ্চিত্র পরিবারের মানুষেরা।

সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, নীতিমালা সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর চলচ্চিত্রাঙ্গনে উৎসব আমেজ বিরাজ করে। আর এই সভাকে চলচ্চিত্রের জন্য আশির্বাদ হিসেবে মনে করছেন অভিনেতা রিয়াজ। বললেন, ‘কোনো ভিনদেশির দোসর, মিথ্যেবাদী বা স্বার্থবাজ ব্যবসায়ীর নয়, অবশেষে চলচ্চিত্রের মানুষদেরই জয় হয়েছে।’

তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি বলবো রোববার দিনটি ছিলো চলচ্চিত্রের দিন। চলচ্চিত্রের মানুষদের দিন। অনেকগুলো দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ দানা বাঁধছিলো। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে বাধ্য হয়েই আমাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে। আন্দোলনটি হয়েছে শিল্পী সমিতির নতুন কমিটি সক্রিয় ভূমিকা রাখায়। শিল্পীরা এর আগে আর কোনো আন্দোলনে এভাবে মাঠে থাকেনি। আমি শিল্পী সমিতি ও শিল্পীদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। শিল্পী ও অন্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আর তীব্র আন্দোলনের মুখেই একটি কুচক্রী মহলের হাত থেকে ইন্ডাস্ট্রিকে রক্ষা করার জন্য মনযোগী হয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। প্রাপ্তিগুলোকে চলচ্চিত্রের মানুষদের আন্দোলনের জয় হিসেবে দেখছি।’

রিয়াজ আরও বলেন, ‘অনেকগুলো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় অনেক আন্তরিক ছিলো চলচ্চিত্রের প্রতি। এটা স্বস্তির বিষয়। সেখানে যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। যতোদিন সংস্কার না হচ্ছে ততোদিন এই সিস্টেমে ছবি নির্মাণ বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহা-পরিচালক হারুন অর রশিদকে মন্ত্রণালয় থেকে আগামী দু’দিনের মধ্যে নতুন যৌথ প্রযোজনার প্রিভিউ কমিটির নির্বাচন চূড়ান্ত নামের তালিকা মন্ত্রণালয়কে দিতে বলা হয়েছে। চূড়ান্ত কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত সকল যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হবে না।’

শাকিব খান ও জাজ প্রধান আব্দুল আজিজকে চলচ্চিত্র পরিবার আজীবন নিষিদ্ধ করেছে। কালকের সভায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা ছিলো কী না জানতে চাইলে রিয়াজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘না, এ বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এই বিষয়ে যা কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার চলচ্চিত্র পরিবারই নেবে। আমি তাদের নিয়ে শুধু এটুকু বলতে পারি, এটা আজ প্রমাণ হয়ে গেছে যে তারা বারবার মিথ্যে বলে অনিয়মকে নিয়ম করতে চেয়েছে।’

তিনি আরো জানান, ‌‘এর সঙ্গে সঙ্গে সাফটা চুক্তি নিয়েও কথা হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, যেহেতু এই চুক্তির সঙ্গে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও জড়িত তাই সবার সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সাফটা চুক্তিতে চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানির ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে এই চুক্তিতে চলচ্চিত্র বিনিময় বন্ধ করা হবে।’

এই অভিনেতা বলেন, ‘আলোচনায় আরো একটি বিরাট সাফল্য রয়েছে। আমি বলবো এটাই সবেচেয়ে বড় সাফল্য। সেটি হলো সরকার কোরবানি ঈদের আগেই ৫০টি এইচডি প্রজেক্টর মেশিন কিনে সিনেমা হলগুলোর প্রজেকশন কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে এর সংখ্যা আরো বাড়বে। এই মেশিনগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন অর্থাৎ এফডিসি। সুতরাং কোনো অসাধু ব্যবসায়ী এখানে নাক গলাতে পারবে না। ছবি নির্মাণে অনেক প্রযোজকই এখন আগ্রহী হবে। আর জিম্মি হয়ে থাকা হলগুলো নিয়েও সরকারের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলোও এফডিসি বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হবে ধীরে ধীরে।’

আরো যোগ করে তিনি বলেন, ‘চলতি মাসের মধ্যেই জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষে জাতীয় নির্বাহী কমিটিও গঠন করা হবে। চলচ্চিত্র পরিবার কর্তৃক পেশকৃত দাবিসমূহ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহন করা হবে শিগগিরিই। সরকার চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরাতে আন্তরিকভাবে পাশে থাকবে বলেও কথা দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী। সবকিছু মিলিয়ে সে দিনটি ছিলো আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য দারুণ একটি দিন। আমাদের দাবি যে অযৌক্তিক ছিলো না, আমরা যে অন্যায় পথে ছিলাম না সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে।’

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক কিছুই আমরা দেখেছি ও সহ্য করেছি। আমাদের কোনো দুঃখ নেই এতে। ইন্ডাস্ট্রি ভালো জায়গায় দাঁড়াতে যাচ্ছে, আবারও ছবির বাজারে ইতিবাচক কিছু হতে যাচ্ছে এই আনন্দে আমরা সব ভুলে যেতে চাই।

আমি আহ্বান করবো, যে যেখানেই ছিলেন ভুলে যান। সবাই মিলেমিশে আসুন চলচ্চিত্রের পাশে দাঁড়াই। আবারো চাইলে সুদিন আনা সম্ভব। দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে, দর্শকের চাহিদার কথা মাথায় নিয়ে আবারও ভালো চলচ্চিত্র বানাই। ইন্ডাস্ট্রি কারো একার নয়। এখানে সবাই কাজ করবে। সিনিয়রদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে সিনেমায়। একঘেয়েমি অভিনয়, একই মুখ, একই স্টাইল পরিহার করতে হবে। আমরা আগেও পেরেছি, আন্দোলন করে ভিনদেশিদের দোসরদেরও থামাতে পেরেছি, আগামীতেও পারবো।’

প্রসঙ্গত, বাংলা চলচ্চিত্রে তার আবির্ভাব হয়েছিলো দারুণ প্রতিযোগিতার এক সময়ে। প্রয়াত অভিনেতা জসীমের হাত ধরে ‌‘বাংলার নায়ক’ ছবি দিয়ে অভিষেক হয় তার। নায়ক হিসেবে তখন তুমুল জনপ্রিয় অমর নায়ক সালমান শাহ, ওমর সানি, আমিন খান, রুবেল, মান্নারা। ইলিয়াস কাঞ্চনও সমান তালে অভিনয় করতেন।

তিদের ভিড়েও নিজেকে আলাদা করে পরিচিত করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন রিয়াজ। ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘নারীর মন’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘মন মানে না’, ‘মন’, ‘প্রেমের তাজমহল’, ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’সহ অসংখ্য ব্যবসা সফল ছবি দিয়ে হয়ে ওঠেছিলেন সুপারস্টার।

ঢাকাই ছবির অন্ধকার যুগে সবাই যখন গা ভাসিয়েছে অশ্লীলতায় তখন শাবনূর-পূর্ণিমাকে নিয়ে প্রায় একাই সুস্থ ধারার দর্শককে হলে টেনেছেন রিয়াজ। হঠাৎ করে নানামুখী রাজনীতির মুখে পড়ে ইন্ডাস্ট্রি। সিনিয়ররা একে একে নিজেদের গুটিয়ে নিতে থাকেন সম্মান, সম্মানী, গুরুত্বহীনতার রাজত্ব দেখে। অনিয়মিত হয়ে পড়েন রিয়াজ ও তার সমসাময়িক অভিনয়শিল্পীরাও।

তবে আশার কথা হলো, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আবারও সরব হয়েছেন রিয়াজ। এফডিসিতে নিয়মিতই আসছেন ফারুক, আলমগীর, সোহেল রানা, রোজিনা, অঞ্জনা, পূর্ণিমা, পপি, ফেরদৌসের মতো নন্দিত তারকারা। তারা অনেকেই চলচ্চিত্রের ব্যবসায়ে ইতিবাচকভাবে আশার আলো দেখে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাতেও আসতে চাইছেন। সরব হয়েছেন অনেক প্রবীন প্রযোজক ও নির্মাতারাও। তারা কেবল ছবি সারা দেশব্যাপী মুক্তির স্বাধীনতা চান। হল ব্যবসাকে চলচ্চিত্র বান্ধব দেখতে চান।
সূত্র: জাগো নিউজ