লোক সাহিত্যিক আব্দুল মতিন চৌধুরী: জীবন ও কর্ম

মো:আব্দুল মালিক, সিলেট নিউজ বিডি: পল্লি সাহিত্য বাংলা ভাষার এক অজ্ঞাত ও অমূল্য সম্পদ। আবহমান কাল থেকে এই সাহিত্য ধারা পল্লির মানুষের জীবনকে সরস করে রেখেছে। এই অমূল্য সাহিত্য সম্পদের দিকে প্রথম দৃষ্টি দেন ড. দীনেশ চন্দ্র সেন। তিনি ময়মনসিংহ গীতিকা প্রকাশ করে পূর্ববঙ্গের এই অতুলনীয় লোকসাহিত্যের দিকে বিদগ্ধজনের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।
সিলেটের লোক সাহিত্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে কয়জন পথিকৃতের গৌরবের অধিকারী তাঁদের মধ্যে আব্দুল মতিন চৌধুরী অন্যতম। সাহিত্য সাধনার জন্য একটি অনুরাগী অন্তর প্রয়োজন। এই অনুরাগ যেকোনো সাহিত্যকর্মীর নিরলস প্রচেষ্টার পেছনে প্রেরণা যোগায়। সাহিত্য যাঁরা রচনা করেন তাঁদের মেধা, দৃষ্টিভঙ্গি ও শক্তির মধ্যে পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্যই লেখকের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ যেকোনো অবস্থাতে একজন লেখককে আতœপ্রকাশে নিয়ত রাখে। এমনই অনুরাগী নিষ্টাবান একজন সাধক হচ্ছেন আব্দুল মতিন চৌধুরী। শারিরীক অসুস্থতা, সাংসারিক টানাপোড়নের মধ্যেও তিনি লোক সাহিত্য সংগ্রহ, স্থানীয় ইতিহাস উদ্ধার ও পুস্তকাকারে প্রকাশ, সাহিত্য সংকলন ও পত্রিকা সম্পাদনা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে করিমগঞ্জ, বদরপুর, শিলচর হতে ‘দূর্জয় বাংলা’ গীতি নক্সা প্রচার করে ভারতীয় জনমত সৃষ্টি করা ও শিলচর হতে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা একক প্রচেষ্টায় সম্পাদনা ও প্রকাশ।

জন্ম: আব্দুল মতিন চৌধুরী ১৯৩৪ সালের ২২ মার্চ, সিলেট জেলাধীন বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুর রহমান চৌধুরী, মাতার নাম মখলিছুন নেছা চৌধুরী।

শিক্ষা জীবন: নিজ গ্রামের ঢাকা উত্তর মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে আব্দুল মতিন চৌধুরীর শিক্ষা জীবনের সূচনা। ঐ বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাথমিক ও মধ্যবঙ্গ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্টিক পাস করে সিলেট টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি হন। সিলেট টেকনিক্যাল স্কুলকে পলি টেকনিকে উন্নিত করার লক্ষে আন্দোলন শুরু হলে তিনি ঐ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নের সময় তাঁর পিতা মারা যাওয়ায় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত হয় বিধায় তাঁর পক্ষে বেশীদূর লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি।

কর্মজীবন: কর্মজীবনে প্রথমে কৃষি বিভাগে পরে আমিনাবাদ ও নূরজাহান চা বাগানে, তারপর ঢাকা গণপূর্ত বিভাগে কিছুকাল চাকুরী করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি লেখালেখি নিয়েই ব্যস্থ ছিলেন।

সাহিত্যিক জীবন: কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ। প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘স্বাগতম যুগভেরী’ ১৯৫৯ খ্রি.। তৎকালিন সাপ্তাহিক যুগভেরী, মাসিক জালালাবাদী, সাপ্তাহিক সুর, মাসিক আল-ইসলা, ভারতবিচিত্রা, দৈনিক জালালাবাদী, দৈনিক সিলেটের ডাক, শিলচর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বরাক, লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা, জনমত ইত্যাদি পত্রিকায় তাঁর বহু ছোট গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সিলেট রেডিও থেকেও তাঁর জীবন্তিকা ও প্রবন্ধ প্রচারিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বইয়েরে মধ্যে রয়েছে- (১) লোক সাহিত্যে সিলেট (১ম, ২য় ও ৩য় খন্ড) (২) হযরত খাজা শাহ্ মাহমুদ আলী চিশ্তী (জীবনী গ্রন্থ) (৩) বিয়ানীবাজারের কথা (৪) গোলাপগঞ্জ দর্পন (৫) বিয়ানীবাজার দর্পন (তথ্য গ্রন্থ) (৬) তিন প্রস্থ (কাব্য গ্রন্থ) (৭) গোন্ধেগোল ও অন্যান্য কিচ্ছা। এছাড়া চেতনা-৮৩, চেতনা-৮৫, চেতনা-৯৩, চেতনা-৯৪, মূল্যায়ন, শিখা, সবুজ পল্লি, তুর্য বাদক ইত্যাদি সাহিত্য সংকলন ও সম্পাদনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শিলচর থেকে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা একক ভাবে সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। যার সংবাদের উৎস ছিল সেক্টর কমান্ডার সি. আর. দত্ত। বস্তুনিষ্ট সংবাদের জন্য সে সময় পত্রিকাটি খুবই জনপ্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর সিলেট গুলবাগ প্রেস থেকে আরও ১১ সংখ্যা প্রকাশের পর অর্থাভাবে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
আব্দুল মতিন চৌধুরীর সংগ্রহ ও সম্পাদনায় লোক সাহিত্যে সিলেট (১ম খন্ড) ১৯৮৬ খ্রি. প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের ১ম পরিচ্ছেদে তিনি লোক কাহিনী সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনা করে ১১টি লোক কাহিনী নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। লোক কাহিনীর শিরোনাম হচ্ছে- (১) তুলাপতি কন্যার কিচ্ছা (২) গোন্ধগোলের কিচ্ছা (৩) সুন্দর জাদীর কিচ্ছা (৪) বুদ্ধির বহর (৫) দুই টগের কিচ্ছা (৬) দিলদার কুমারের কিচছা (৭) উপদেশের মূল্য (৮) হাজারী মাল (৯) যোগী গণক (১০) খোদার দর্শন (১১) ন্যায় দন্ড।

২য় পরিচ্ছেদে মারফতি গান সম্পর্কে আলোচনা করে পাঁচজন মরমি কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতসহ তাঁদের কালজয়ী গান সংকলন করেছেন। যাঁদের গান সংকলন করেছেন তাঁদের নাম ও সংকলিত গানের সংখ্যা হচ্ছে ঃ (১) ইয়াছিন আলী ১০টি (২) দ্বীন ভবানন্দ ১০টি (৩) ইব্রাহিম তশনা ১০টি (৪) শিতালং শাহ্ ৯টি (৫) আরকুম শাহ ৯টি।
তৃতীয় পরিচ্ছেদে আছে বিয়ের গান সম্পর্কে আলোচনাসহ ২২টি বিয়ের গান। এখানে প্রাসঙ্গিক মনে করে দু’টি গান তুলে ধরলাম-

(১) পুকুরের পারেরে চম্পা নাগেশ্বর রে
তাতে মিলে হাজারোনা ডালোরে।
হাজারো না ডালোরে হাজার কলি ফুটেরে
বিবিয়ে মাঙ্গঁইন আজব দুটি কলিরে।
দুটি কলির বদলে হাজার কলি দিমুরে
ছাড় যদি দয়াল মাইজির মায়ারে।
মায়ে যে পালিছইনরে দুধ কলা দিয়ারে
কেমনে ছাড়িমু দয়াল মাইজির মায়ারে।
ভাইয়ে যে পালিছইনরে হাজার মায়া দিয়ারে
কেমনে ছাড়িমু দয়াল ভাইয়ের মায়ারে।
বইনে যে পালিছইনরে হাজার মায়া দিয়ারে
কেমনে ছাড়িমু দয়াল বইনের মায়ারে।
সকলের মায়া যেমন তেমন,
দাদির মায়া আছানক রে
কেমনে ছাড়িমু দয়াল দাদির মায়ারে।

(২) সুনামগঞ্জের রঙিলা দামান্দ মাই রে ডাকইন
মাইনি আছইন ঘরে।
খুশির বিদায় দিবায় মাইগো যাইতাম শশুড় দেশে।
যাও যাও ওরে বাছা যাও শশুড় দেশে
বেইলের দুইপর অইলে বাছা আইও মাইজির কোলে।
সুনামগঞ্জের রঙিলা দামান্দ চাচিরে ডাকইন
চাচিনী আছইন ঘরে
খুশির বিদায় দিবাগো চাচি যাইতাম শশুড় দেশে
বেইলের দুইপর অইলে বাছা আইও মাইজির কোলে।
সুনামগঞ্জের রঙিলা দামান্দ বইনরে ডাকইন
বইননি আছইন ঘরে।
খুশির বিধায় দিবায় গো বইন যাইমু শশুড় দেশে।
যাও যাও আরে ভাইধন যাও শশুড় দেশে
বেইলের দুইপর থাকতে ভাইধন আইও মাইজির কোলে।

লোক সাহিত্যে সিলেট (১ম খন্ড) বইটিতে নিবেদন শিরোনামে আব্দুল মতিন চৌধুরী লিখেছেন, ‘লোক সাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহের লক্ষে আমি শুধু সিলেটের পূর্বাঞ্চল ও মৌলভীবাজারের কিছু অংশ ভ্রমণ করেছি মাত্র। আমার ধারণা হয়েছে বৃহত্তর সিলেটের প্রতিটি গ্রামের লোকের মুখে মুখে আজও লোক সাহিত্যের যে অমূল্য ভান্ডার পড়ে আছে সঠিক ভাবে সংগ্রীহিত হলে তা কেবল বাংলাদেশের লোক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে না বরং বিশ্ব লোক সাহিত্য ভান্ডারে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘লোক সাহিত্যে সিলেট রচনার প্রেরণা ও উৎসাহ দাতা হচ্ছেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী। যাঁর নির্দেশে আমি সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল ঘোরে লোকগাঁথা, লোকগীতি, বিয়ের গান, ধাঁধা ও অন্যান্য প্রবাদ, প্রবচন, সংগ্রহ করি। সত্যিকথা বলতে গেলে লোক সাহিত্য সম্পর্কে আমি ছিলাম উদাসিন।’ এই গ্রন্থের ভূমিকায় বিশিষ্ট লোক সাহিত্য গবেষক, বাংলা একাডেমির প্রাক্তন পরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘বিয়ানীবাজার ও সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের ১১টি গল্প, ৪৮টি মারফতি গান ও ২২টি বিয়ের গান ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে ১ম খন্ডের এই সংগ্রহ। গল্পগুলোর টাইপ, মটিফ নিয়ে একটি নতুন গ্রন্থ এবং গানগুলোর তুলনামূলক গবেষণা ও থিসিস হতে পারে। যাঁরা ভবিষ্যতে ডক্টরেট পর্যায়ে কাজ করবেন এ দায়িত্ব তাঁদের। আমরা আশা করি জনাব চৌধুরীর দৃষ্টান্ত সমৃদ্ধ সিলেটের লোক সাহিত্য নিয়ে আরও উৎসাহী সংগ্রাহকগণ এগিয়ে এসে সোনার বাংলায় এই সোনার ফসলকে বিশ্ব বিখ্যাত করবেন।’
অধ্যাপক বিরেশ চক্রবর্তী এই বইটি সম্পর্কে বলেন, “পাশ্চাত্যে লোকসাহিত্য সংগ্রহের জন্য যেখানে ফোকলোর সোসাইটি রয়েছে, সেখানে আমাদের দেশে এ জাতীয় লোকসাহিত্য সংগ্রহের জন্য এমন কোন ব্যবস্থা নেই। তাই আব্দুল মতিন চৌধুরী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে লোক সাহিত্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে শ্রম ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। তাঁর এ সংগ্রহ আমাদের লোকসাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস।”
আব্দুল মতিন চৌধুরী সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত বারটি লোককাহিনীর সংকলন ’সিলেটের লোককাহিনী’ নামে একটি পান্ডুলিপি বাংলা একাডেমিতে জমা দিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি লোকসাহিত্যে সিলেট (২য় খন্ড) ২৮৫টি ধাঁধা এবং লোকসাহিত্যে সিলেট (৩য় খন্ড) ৮৭টি ছড়ার পান্ডুলিপি ও প্রণয়ন করেছেন।
আব্দুল মতিন চৌধুরীর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘তিন প্রস্থ’ ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে রয়েছে মোট ৩৮টি কবিতা। কবি এই কাব্যের কবিতাগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রতিটি ভাগকে তিনি প্রস্থ নামে উল্লেখ করেছেন। প্রথম প্রস্থে ধর্মীয় ভাবধারায় লিখিত, দ্বিতীয় প্রস্থে রাজনৈতিক ভাবধারা এবং তৃতীয় প্রস্থে কবির ব্যক্তিগত চিন্তা ও ধ্যান ধারনা প্রসূত কবিতাগুলো স্থান পেয়েছে।
প্রথম প্রস্থের দু’টি কবিতা-
‘সিয়াম সাধনা’
সিয়াম এসেছে এবং আসবে চিরকাল
যতদিন ধরাধামে ইসলামের জয়যাত্রার
অব্যাহত গতি ধারা চলবে,- ততদিন।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সিয়াম শুধু কি-
উদয়াস্ত অভুক্ত থাকার সাধনা
নিরন্তু উপোসের সংগ্রাম
না অন্য কিছু মানুষের তরে ?
সিয়ামের সাধনা মানুষকে শিক্ষা দেয়

‘সংযত থাকার’
নিজের লোভ লালসাকে সংযত করার
এক কঠিনতম আদর্শের পথ নির্দেশ
যে পথে মঙ্গল আনে
আনে শান্তি, বৃহত্তর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

‘ঈদ এলো’
সিয়ামের শেষে কাঙ্খিত ঈদ এলো
পূত পবিত্র রূপ নিয়ে।
জননী, জায়া, ভ্রাতৃবধু, ভ্রাতা, পুত্র কন্যা
সকলেই পুলকিত ঈদের খুশিতে।
সিয়াম সাধনা মাসব্যাপী আত্মসংযম
উপবাস, আরাধনা, সার্থকতার রূপ নিবে
ঈদের মাধ্যমে
এটা মোমিনের ঈদ।
দ্বিতীয় প্রস্থ রাজনৈতিক আদর্শের ১ম কবিতা এরকম-
‘বঙ্গঁবন্ধু’
বঙ্গঁবন্ধু তোমায় আমি শ্রদ্ধা করি আমার সর্ব সত্তা দিয়ে
কেননা তুমি বিপ্লবোত্তর রক্তক্ষয় বন্ধ করে
সাধারন ক্ষমা করেছিলে বিরুদ্ধ বাদীদের
এবং তারা তোমার সে মহৎ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে
আজো বিরোধীতা করে তোমার ও তোমার
রেখে যাওয়া আদর্শের।
কিন্তু তারা কি জানে না ?
তাদের এ বিরোধীতার সুযোগটুকু তোমার দান।
তাই বিশ্ব মানবতা তোমাকে দিয়েছিল
‘জুলী ও কুরীর’ দুর্লভ সম্মান।
বৃটেনের রানী এলিজাবেথকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতা-
‘নিমন্ত্রণ’
সবুজের ছায়াঘেরা পাখিদের কলতানে ছন্দময়
সুরমার কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে
শতাব্দীর স্তদ্ধ নকীব আমার জন্মভূমি
আমার গ্রাম, তোমাকে আমি আমন্ত্রণ জানাই,
আমার নিজ গ্রামে
তব পর্দাপন, শুভ পর্দাপন যদি হয়ে যায়।
পরে ইংল্যান্ড ভ্রমণে গেলো তিনি এই কবিতাটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে রাণীকে উপহার দেন। মহামান্য রাণী তাঁকে ধন্যবাদপত্র পাঠান। এভাবে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কে নিয়ে লেখা কবিতার জন্য ভারত সরকার ও তাকে ধন্যবাদপত্র দেন।
তৃতীয় প্রস্থের কবিতা, নিজের গ্রামকে নিয়ে রচিত

(ক) ‘গ্রামের নাম আলীনগর’
আলী নগর বিয়ানীবাজারের ছোট্ট একটি গ্রাম
হোক না সে যতই ছোট্ট আমার জন্মভূমি;
……………..।
(খ) ‘আমার প্রিয় শিলচর’
শিলচর আমার প্রিয় শিলচর
বরাকের কূলে ভারত তনয়
তোমাকে আমি ভালবাসি
কেন না তোমার বুকে যারা বাস করে
তারা আমায় ভালবাসতো
আমাকে কোলে স্থান দিয়েছিল
চরম বিপদ লগ্নে।
আব্দুল মতিন চৌধুরী সহজ সরল বর্ণনার মধ্যদিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর কবিতায় অতিকথন নেই, অনাবশ্যক জটিলতা নেই এবং কবিতা গুলোর গাথুঁনি শিথিল বলা যাবে না। এসব কবিতার মধ্য দিয়ে তাঁর ধর্ম চিন্তা, রাজনৈতিক চিন্তাধারা সর্বোপরি নিখাদ দেশপ্রেমের ধারণা পাওয়া যায়। আব্দুল মতিন চৌধুরী স্থানীয় ইতিহাস ঐতিহ্য লোক সংস্কৃতির অনুসন্ধানে আতœনিবেদিত ছিলেন। আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় তাঁর অবদান হচ্ছে বিয়ানীবাজারের তথ্য কথা, বিয়ানীবাজার দর্পন, গোলাপগঞ্জ দর্পন গ্রন্থ ত্রয়। স্থানীয় ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে ইতিহাসের সাথে জড়িত গীতি কবিতাও সংগ্রহ করেছেন তিনি। যেমন- ইটায় থাকইন কটা মিয়া, লংলায় র্কলা বিয়া, বড় শখ অইল মিয়ার লংলা দেখতা গিয়া অথবা আওর অইলে আখালুকি আর সবকুয়া, বেটা অইলে মামদ মনসুর আর সব পুয়া ইত্যাদি।

পারিবারিক জীবন: স্ত্রী হাফছা খানম চৌধুরী, ৬ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তান নিয়ে ছিল তাঁর পারিবারিক জিবন।

সম্মানীত সদস্য: আব্দুল মতিন চৌধুরী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট ও বাংলা একাডেমি, ঢাকার আজীবন সদস্য ছিলেন।

বিদেশ ভ্রমন: আব্দুল মতিন চৌধুরী ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ভ্রমন করেছেন।

মৃত্যু: আব্দুল মতিন চৌধুরী ১৯৮৯ সাল থেকে ডায়াবেটিক রোগে ভোগছিলেন এবং ১৯৯০ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ স্থানীয় পত্রিকাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান শোক বানী প্রদান করেন।
আব্দুল মতিন চৌধুরীর মত বর্ণাট্য জীবনের অধিকারী ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এত অল্প সময়ে ও অল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবুও আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান, চিন্তা, চেতনা ও সামর্থ্য থেকে এ গুনী ব্যক্তিকে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। নতুন গবেষকদের প্রতি আমার উদাত্ত আহবান আপনারা আব্দুল মতিন চৌধুরীকে নিয়ে গবেষণা করবেন এবং নতুন প্রজন্মের সামনে তা তুলে ধরবেন। আব্দুল মতিন চৌধুরীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখা নিয়ে যদি একটি রচনা সমগ্রহ প্রকাশ করা হয় তাহলে তাঁর আজীবনের শ্রম স্বার্থক হবে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উপকৃত হবে। বিষয়টির প্রতি আমি সুধি মহলের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মো:আব্দুল মালিক

তথ্য সূত্র: ১। বাংলা সাহিত্যে সিলেট- ৩য় খন্ড- শামসুল করিম কয়েস ২। ফোকলোর চর্চায় সিলেট- নন্দলাল শর্মা ৩। গোলাপগঞ্জ দর্পন- আব্দুল মতিন চৌধুরী ৪। বিয়ানীবাজারের কথা- আব্দুল মতিন চৌধুরী ৫। লোক সাহিত্যে সিলেট- আব্দুল মতিন চৌধুরী ৬। হযরত খাজা শাহ মাহমুদ আলী চিশ্তী- আব্দুল মতিন চৌধুরী