সিলেট নিউজ বিডি ডেস্ক: দুর্ঘটনা এড়াতে শুধু চালকদের দোষারোপ করলে হবে না, পথচারীদেরও সড়কের নিয়মগুলো মানার উপর জোর দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের সহায়তাও চেয়েছেন তিনি।
বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন একথা বলেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার এই কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, সেটা আমরা কতটা মানি? একটা গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা হাত একটা তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম…. যারা পথচারী, তাদেরও কিছু রুলস জানা দরকার, মানা দরকার।
শেখ হাসিনা বলেন, আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারাও (সাংবাদিক) যার হাত গেল, তার জন্য কান্নাকাটি করছেন; কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না, সে কথা তো বলছেন না।
এসময় সড়ক দুর্ঘটনা হলেই আইন হাতে নিয়ে চালককে মারধর না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী দায়ী চালকের শাস্তির কথা বলেন তিনি। সড়ক পরিবহন আইনটি প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
কোটা প্রসঙ্গে প্রশ্নের এক উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, কোটা সংস্কার ছাত্রদের বিষয় না। এটা সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়। ছাত্ররা কোটা ব্যবস্থা বাতিল চেয়েছে, বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সেটা নিয়ে এখন প্রশ্ন আনার দরকার কী?
তিনি বলেন, ছাত্ররা দাবি করেছে, সেটি মেনে নেওয়া হয়েছে। এখন হা-হুতাশের কী আছে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলা কোটাও বাতিল হয়ে গেছে। এখন পিছিয়ে পড়া বলে কেউ অভিযোগ করতে পারবে না। আন্দোলনের সময় অনেকের ছবি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, এখন কেউ এসে পিছিয়ে পড়া হিসেবে চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ করতেও পারবে না।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়, এখানে আমাদের কিছু করার নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তো তাকে জেলে দেইনি। আমি যদি তাকে জেলে দিতাম তাহলে সেই ২০১৫ সালে যখন মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করলো তখনই দিতে পারতাম। কিন্তু তা আমরা করিনি।
তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে ৬৮জন লোক নিয়ে খালেদা জিয়া নিজেই নিজেকে একটি ঘরে মধ্যে অবদ্ধ করে রাখলেন। সেখান থেকে নির্দেশ দিয়ে একের পর এক মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করলেন।
এমনকি তার ছেলে মারা গেলো, আমি গেলাম তাকে সমবেদনা জানাতে। উল্টো আমাকে মুখে উপর দরজা বন্ধ করে দেয়া হলো। তখন কী করা উচিত ছিলো, উচিত ছিলো বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেয়া। যাতে কেউ আর বের হতে না পারে।
তিনি বলেন, আমি চাইলে তা পারতাম, কিন্তু করিনি। আমি রাজনৈতিকভাবে কিছু করতে চাইনি বলেই করিনি।
তবে একটা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্যায় কোনটা জানেন? ফাতেমার বিষয়টা। একজন অপরাধীর (খালেদা জিয়া) সঙ্গে নিরপরাধ ফাতেমাকেও কারাগারে কাটাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, পৃথিবীর কোন দেশে আছে, একজন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর সঙ্গে সহকারী দেয়া হয়?
তারেক রহমানকে দেশে ফেরানো বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারেক রহমান একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামী। সে বিদেশের মাটিতে রয়েছে, সেখানে বসে প্রতিদিন তারা দেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। আমরা অনেক দেশ থেকে এ ধরণের আসামীকে নিয়ে এসেছি। আমরা নিশ্চই তারেককেও নিয়ে আসবো।
তারেক রহমানের পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বলছে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছে। কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রেয় নিলে নিয়মেই আছে সে আর নিজ দেশে ফিরতে পারবে না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে আবেদনে উল্লেখ করতে হয় সে যে দেশের পাসপোর্ট নিয়ে এসেছে সে দেশে ফিরতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে ব্রিটেনের সঙ্গে কথা হয়েছে। সে দেশের আইন অনুযায়ী যেভাবে সম্ভব আমরা তাকে ফিরিয়ে আনবো।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে বয়সসীমা এবং ছাত্রত্ব আছে কিনা তা দেখা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের আসন্ন জাতীয় সম্মেলনে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেভাবে হওয়ার সেভাবেই হবে। ইতোমধ্যে কে কে প্রার্থী তাদের তালিকা নেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি আছে। তালিকায়ে আসা আগ্রহীদের ডেকে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। হলে এই কমিটির প্রেস রিলিজ দেওয়া হবে। এতে সফল না হলে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ভোট হবে। তবে ভোটের মাধ্যমে হওয়ারও একটা ঝামেলা আছে। তারা ইয়াং ছেলেপুলে, ভোটের মধ্যে অনেক কিছুই হতে পারে। তারা প্রভাবিত হতে পারে। তবে আমরা দেখবো যদি ভোটের মধ্যে যোগ্য নেতৃত্ব এসেছে কিনা। না এলে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনারা জানেন, ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে একটা উপযুক্ত বয়সসীমা রয়েছে, তাদের ছাত্র হতে হবে। এদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হবে।
রোহিঙ্গাদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে বিশ্ব সম্প্রদায়। কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রশংসা হয়েছে, সম্মেলনের ঘোষণায় রোহিঙ্গা বিষয়ক অনুচ্ছেদ যুক্ত হয়েছে। যেটা আমাদের সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনে রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের ভূমিকার যে প্রশংসা হয়েছে, তা সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য।
সফরে অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসাও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
নারীর অধিকার সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম আমাদের সংবিধানে নারীদের জন্য সমান অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করে গেছেন।
এসময় অস্ট্রেলিয়ায় গ্লোবাল সামিট অন উইমেনে প্রাপ্ত ‘গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ দেশের নারী সমাজের প্রতি উৎসর্গ করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।
এর আগে বিকেল চারটায় প্রধানমন্ত্রী সরকারি বাসভবন গণভবনে এ সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সম্প্রতি বিদেশ সফরের চিত্র তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে উপস্থিতি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল ৮ দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যে যান। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় আল জুবাইল প্রদেশে অনুষ্ঠেয় ‘গালফ শিল্ড-১’ নামের একটি যৌথ সামরিক মহড়ার কুচকাওয়াজ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। এরপর কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠকে (সিএইচওজিএম) যোগদানের জন্য ১৬ এপ্রিল লন্ডনে যান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি ১৭ এপ্রিল সকালে ওয়েস্টমিনস্টারের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ নারী ফোরামের ‘এডুকেট টু এম্পাওয়ার: মেকিং ইকুইটেবল অ্যান্ড কোয়ালিটি প্রাইমারি এডুকেশন অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন আ রিয়েলিটি ফর গার্লস অ্যাক্রোস দ্য কমনওয়েলথ’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেন।
১৮ এপ্রিল শেখ হাসিনা এশীয় নেতাদের ‘ক্যান এশিয়া কিপ গ্রোইং?’ রাউন্ড টেবিলে অংশ নেন। ১৯ এপ্রিল শেখ হাসিনা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠকের (সিএইচওজিএম) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তিনটি ‘রিট্রিট সেশন’ ও শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী কার্যনির্বাহী অধিবেশনে অংশ নেন এবং ২১ এপ্রিল তিনি রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটি (আরসিএস) আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকারপ্রধানদের জন্য সংবর্ধনা এবং রানির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে ২৩ এপ্রিল তিনি দেশে ফেরেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবশেষ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে অস্ট্রেলিয়া যান। সিডনির আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে (আইসিসি) এক অনুষ্ঠানে গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮ গ্রহণ করেন তিনি।
বাংলাদেশে নারী শিক্ষার প্রসার এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি হিসেবে ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’ শেখ হাসিনাকে এ সম্মাননা দেয়। ওই সফর শেষে তিনি গত ২৯ এপ্রিল দেশে ফেরেন।
Sylhetnewsbd Online News Paper