সিলেট নিউজ বিডি ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তবে এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। গত অক্টোবরে ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেছেন। সম্প্রতি আবুধাবিতে সামিনাহ জামানের নেওয়া সাক্ষাত্কারটি শনিবার প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, যেখানে বাংলাদেশসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে নিপীড়নের শিকার অমুসলিমদের নাগরিকত্বের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি না কেন তারা (ভারত সরকার) এটি করেছে। এর দরকার ছিল না।’
গালফ নিউজের খবরে বলা হয়, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হয়। এই আইনে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে নিপীড়নের শিকার হয়ে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের আগে ভারতে যাওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ হিন্দু ও শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। তবে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে বাংলাদেশ থেকে কারো ভারতে যাওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভারত থেকে কারো বাংলাদেশে আসার ঘটনাও ঘটেনি। তবে ভারতের মধ্যেই অনেকে নানা সমস্যায় আছেন।
গত মাসে ভারতের পার্লামেন্টে সিএএ আইন পাশ এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) করার ঘোষণা দেওয়ার পর ভারত জুড়ে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন যে ভারতে যেসব মুসলিম নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হবেন, তারা বাংলাদেশে চলে আসতে পারেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সিএএ ও এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সে বিষয়ে গত অক্টোবরে ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোদিও আমাকে আশ্বস্ত করেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হতে হবেঃ
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের ভূমিকায় উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারে শুরু, সমাধানও তাদের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থপূর্ণ উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার। রোহিঙ্গারা সেখানে স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি না হওয়ায় দুইবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমার ব্যর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে নেওয়া সম্ভব নয়। এই সংকট জিইয়ে থাকলে তা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই রোহিঙ্গা সংকটের যথাযথ সমাধান হওয়ার আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে থাকা।
কার্বন নিঃসরণ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পঃ
পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উত্পাদনে আরো বেশি কয়লা পোড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, কয়লা প্রকল্পগুলোর কারণে ব্যাপকভাবে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। তিনি বলেন, বর্তমানে কয়লা থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়। এটি ২৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বাংলাদেশ খুব কম পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশে ২৯টি কয়লাভিত্তিক নতুন বিদ্যুেকন্দ্র তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রায় ২২ বছর আগে দিনাজপুরে প্রথম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করা হয়। এর কারণে পরিবেশের খুব বেশি ক্ষতি হয়েছে তা আমরা দেখিনি। আমি নিজে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি।’
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমছেঃ
অতীতে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকেই বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদিত হতো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক দশক আগেও গ্যাস থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হতো। কিন্তু মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। তাই কয়লা, তরল জ্বালানি, পরমাণু শক্তিই গ্যাসের বিকল্প। তিনি বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষের কাছে বিদ্যুত্ পৌঁছেছে। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় তাদের মোবাইল ডিভাইস, কম্পিউটার এবং ডিজিটাল ক্লাসরুমের জন্যও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি করছে। এছাড়া নেপাল, ভারত ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের জলবিদ্যুত্ উত্পাদন চুক্তিও রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ২.৪ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে।
প্লাস্টিকের ওপর নিষেধাজ্ঞাঃ
সম্প্রতি বাংলাদেশ জানিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চল ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও ২০০২ সাল থেকেই পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যেটি যথাযথভাবে কার্যকর নয়।
পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধে সফল না হওয়ার কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এর কারণ হলো সাশ্রয়ী মূল্যে এটির ভালো বিকল্প না থাকা।এখন আমাদের ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের উচ্ছিষ্ট থেকে তৈরি বায়োডিগ্রেডেবল (পচনশীল) ব্যাগের মতো ভালো বিকল্প রয়েছে। আমাদের একজন বিজ্ঞানী পাট থেকে বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। আমি এটির নাম দিয়েছি ‘সোনালি ব্যাগ’। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি বাণিজ্যিকভাবে এই ব্যাগ উত্পাদন করতে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করতে।”
বাংলাদেশ ও ইউএইর সম্পর্কের ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাত্কারভিত্তিক আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গালফ নিউজ। যেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইউএইর জন্য বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে। ইউএই গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখায় প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ইউএই কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে যে শিগগিরই ভিসা ইস্যু শুরু হবে। আমরা এই প্রতিশ্রুতিতে আশাবাদী।’
Sylhetnewsbd Online News Paper