ধর্ম কি?
ধর্ম অতি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান। বর্তমান মানুষের পূর্ববর্তী নিয়ান্ডারথাল মানুষেরও ধর্ম ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও ধর্ম আছে। কিন্তু বিভিন্ন যুগে ও বিভিন্ন সমাজের ধর্ম এক নয়। কোনও ধর্ম একেশ্বরে বিশ্বাস করে আবার কোন ধর্মে দেব-দেবীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। আবার অনেক ধর্মে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, শুধু ভূত-প্রেতকে কেন্দ্র করে ধর্ম গড়ে উঠেছে।
সকল ধর্মকে সমদৃষ্টিতে দেখে, ধর্মের বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গেলে তিন ধরনের সংজ্ঞার সন্ধান মেলে। যথা- মূল্যবোধভিত্তিক, বর্ননামূলক এবং কার্মিক বা ক্রিয়াবাদী।
মূল্যবোধভিত্তিক সংজ্ঞায় ধর্ম কি হওয়া উচিত তাই নির্দেশ করা হয়। এই ধরনের সংজ্ঞায় ধর্মকে একটা নির্দিষ্ট মূল্যবোধের ছাঁচে ফেলে যাচাই করা হয়। একথা বলা বাহুল্য যে, ধর্মের বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় মূল্যবোধভিত্তিক সংজ্ঞার স্থান নাই।
বর্ননামূলক সংজ্ঞা কতিপয় বিশ্বাস ও আচার পদ্ধতিকে ধর্ম বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু বিশ্বাস ও আচার পদ্ধতিগুলোর মূল্য যাচাই করেনা এবং তাদের কার্যকারিতা নির্দেশ করেনা। এই ধরনের সংজ্ঞায় ধর্মের বিশ্বাস ও আচার পদ্ধতিগুলোকে তুলে ধরা হয় এবং ধর্ম বাস্তবক্ষেত্রে কি, তাই বোঝানো হয়।
কার্মিক বা ক্রিয়াবাদী সংজ্ঞায় ধর্মকে তার কর্মের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ধর্মের কাজ আলোচনা করে ধর্মকে বোঝানো হয়।
মনীষী ফ্রেজার এর মতে, ধর্ম হচ্ছে মানুষের চেয়ে উচ্চতর এমন এক শক্তির সমষ্টি বিধান, যে শক্তি মানবজীবন ও প্রকৃতির ধারাকে নিয়ন্ত্রন ও পরিচালনা করে। তার মতে ধর্মের মূল উপাদান দুটি- একটি মানুষের চেয়ে উচ্চতর শক্তিতে বিশ্বাস; আর অপরটি সেই অতিমানবিক শক্তির আরাধনা।
ইংরেজ নৃবিজ্ঞানী টেলার বলেছেন, ধর্ম হচ্ছে প্রেতাত্মায় বিশ্বাস। আদিম মানুষ মনে করতো যে মানুষ দেহ ও আত্মার সমষ্টি। দেহ ও আত্মা দুই মিলিয়েই জীবন। মৃত্যুতে আত্মা দেহ থেকে বিছিন্ন হয়। মৃত্যু হলে দেহ বিনষ্ট হয় কিন্ত আত্মা মরেনা। আত্মা অবিনশ্বর। মৃত্যুর পরে আত্মা দেহ থেকে বিছিন্ন হয়ে প্রেতাত্মায় পরিনত হয়। মৃত মানুষের বিদেহী আত্মাই প্রেতাত্মা।
ফরাসী সমাজ বিজ্ঞানী এমিল দুরখাইম ধর্মের অন্য সংজ্ঞা দিয়েছেন। বিভিন্ন ধর্মমত বিশ্লেষন করে দুরখাইম দেখতে পান যে, ধর্মের মূল উপাদান দু’টি- বিশ্বাস এবং আচার। ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোর বিশেষত্ব এই যে, সেগুলো বস্তুবাদী ও ভাববাদী জগতের মধ্যে দু’টি পরস্পরবিরোধী শ্রেণীবিভাগ কল্পনা করে। দুরখাইম জগৎ সংসারের এই দুটি ভাগের নাম দিয়েছেন-পবিত্র ও অপবিত্র। ঈশ্বর, দেব-দেবী, প্রেতাত্মা, ভূতপ্রেত সবই পবিত্র জগতের অঙ্গ। অপবিত্র জগত হচ্ছে জীবিকার সন্ধানে পরিশ্রমী মানুষের দৈনন্দিন জীবন। এই দুই জগতের মধ্যে প্রভেদ চরম ও স্পষ্ট।
দুরখাইমের মতে ধর্মবিশ্বাসগুলো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা জোটের সমষ্টিগত বিশ্বাস। সমগ্র জোট যৌথভাবে বিশ্বাসগুলোর প্রতি আস্থাশীল এবং সমগতভাবে আচার-পদ্ধতিগুলো পালন করে থাকে। একটি সার্বজনীন বিশ্বাসের সূত্রে জোটের প্রত্যেকে একে অপরের সহিত গ্রথিত।
ধর্ম বলে চিহ্নিত সকল ব্যবস্থার মূল উপাদান দু’টি – একটি তত্ত্বীয় ধর্ম কতকগুলো বিশ্বাসের সমষ্টি। আর অপরটি ব্যবহারিক- ধর্ম কতকগুলো আচার-পদ্ধতি ও সামাজিক সম্পর্কের সমষ্টি। আধুনিক সভ্য জগতে প্রচলিত ধর্মগুলোতে বিশ্বাসই প্রধান কিন্তু আদিম মানুষের সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসের চেয়ে আচার-পদ্ধতির ভূমিকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।
Sylhetnewsbd Online News Paper