সিলেট নিউজ বিডি ডেস্ক: শিক্ষার্থীদের নামে করা মামলা প্রত্যাহার এবং ছাত্রী নিপীড়নের বিচারের দাবিতে গত মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করার পরিপ্রেক্ষিতে সংঘাত ও হামলার ঘটনায় ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলছে। গত বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে ‘সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে মানববন্ধন করে ছাত্রলীগ। অন্যদিকে হামলার ঘটনায় শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মশাল মিছিল করে ছাত্র ইউনিয়নের মহানগর সংসদ। এ ছাড়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছে। ওই দিনের হামলায় এই বিভাগেরও বেশ কয়েকজন মারধরের শিকার হয়।
শুক্রবার(২৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বাম ছাত্রসংগঠনের মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট সংহতি সমাবেশ করবে। পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে ছাত্রলীগও মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করবে বলে জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার তিন দফা দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানকে অবরুদ্ধ করে সাধারণ ও বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপাচার্যকে উদ্ধার করতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় ও মারধর করে ছাত্রলীগ। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বাম ছাত্রসংগঠনের অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়।
ছাত্রলীগের মানববন্ধন : গতকাল সকাল ১১টায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে ছাত্রলীগের মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন বিভাগের কয়েক শ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের হাতে ছিল দাবি লেখা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। সেখানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী বেনজির আহমেদ বলেন, ‘উপাচার্যের ওপর হামলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ বিনষ্টকরণ, ছাত্রী বোনদের শারীরিক লাঞ্ছনা, কর্মচারী ভাইদের মারধর ও শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্টকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবিতে আমরা মানববন্ধন করছি।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ বিনষ্ট করেছে, তাদের সুস্পষ্ট শাস্তির দাবি জানাই।’
মানববন্ধনের সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আমরাই সাধারণ শিক্ষার্থী, আমাদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী ব্যানার’ চুরি করে বহিরাগত অছাত্ররা বাম আন্দোলন করছে। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী হলে উপাচার্যের ওপর আক্রমণ করতে পারে না।” ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচিতে আমরা সমর্থন জানিয়েছি। উপাচার্যকে অসম্মান ও সম্পদ ক্ষতিসাধনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের এই অবস্থানের প্রতি সহমত পোষণ করছি।’
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন : নিপীড়নবিরোধী কর্মসূচিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীসহ আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছে বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এই বিভাগের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহসভাপতি ও ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মীর আরশাদুলসহ আরো কয়েকজন ওই দিনের হামলায় আহত হয়। দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হকও অংশ নেন। মুখে কালো কাপড় বেঁধে হামলা ও জড়িতদের বিচারের দাবি জানানো হয়।
অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, ‘এ হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই দায়ী। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা গণতান্ত্রিকভাবে মোকাবেলা করা উচিত ছিল। গণতান্ত্রিক দেশে একটা দাবি তুলবে; সেটার সমাধান গণতান্ত্রিক উপায়েই হতে হবে। এভাবে পেটুয়াবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি কাঙ্ক্ষিত নয়।’
ছাত্র ইউনিয়নের মশাল মিছিল : বিকেলে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে মিছিল বের করে ছাত্র ইউনিয়নের মহানগর সংসদ। মিছিলটি কাঁটাবন মোড় ঘুরে শাহবাগে এসে শেষ হয়। সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জি এম জিলানী শুভ বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা উপাচার্য ও প্রক্টরের ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করেছে। তাঁরা ব্যর্থতা ঢাকার জন্য ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুখ বন্ধ করতে চেয়েছেন। সেখানে আঘাত করার মতো কোনো ঘটনা না থাকলেও মারধর করা হয়েছে। সেখানে গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করা হয়। এই হামলার দায়ভার অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিতে হবে। আমরা দ্রুত অভিযুক্তদের শনাক্ত করে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’
প্রসঙ্গত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই ঘটনার পরদিন বুধবার থেকে পাঁচ দফা দাবিতে পাল্টা আন্দোলন শুরু করেছে ছাত্রলীগ। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে উপাচার্যের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনাকারী এবং ভাঙচুরকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের ওপর হামলাকারী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, তানভীর আহমেদ মুঈন, বেনজীর, তুহিন কান্তি, সাদিক রেজা, তমা, সুদীপ্ত, সালমান, ইভা, তমা শাকিল, ইরা, সোহেল রিফাত, সিদ্দীকী, জামিল, মিথিলাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার, প্রক্টর অফিস ভাঙচুর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলাকারীদের বহিষ্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ক্যামেরা ভাঙচুরকারীদের শাস্তি এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্টকারীদের শাস্তির আওতায় আনা।
অন্যদিকে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে পাঁচ দফা দাবিতে ২৯ জানুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেওয়াসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের দাবি হচ্ছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার, ১৫ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে যুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও মামলা প্রত্যাহার, আহতদের চিকিৎসা ব্যয় প্রশাসনের বহন, অবিলম্বে ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের যুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসন। হামলাকারীদের বিচার না করলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
Sylhetnewsbd Online News Paper