ফসল রক্ষা বাঁধ: শেষ করার কথা থাকলেও শুরুই হয়নি তাহিরপুরে

আহম্মদ কবির,সিলেট নিউজ বিডি: সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী (২৮ শে ফ্রেরুয়ারী) ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মানের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তাহিরপুর উপজেলার ৮টি পিআইসির বাঁধের কাজ এখনো শুরু হয়নি। গত বছরের ন্যায় এবারও বোরো ফসল হারানোর দুশ্চিতায় রয়েছে হাওর পাড়ের কৃষকগন। বিগত বছরগুলোতে এই সময়ে সকল হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়। স্থানিয় কৃষকগনের মতে বাঁধ নির্মানের কাজ সময় মত না হলে বাঁধ মজবুত হবে না বরং দুর্ভল হবে। এবং বৃষ্টিতে বাঁধ নরম হয়ে সামান্য পানির চাপে ভেঙ্গে যাবার আশংকা থাকবে। যার ফলেই হাওর পাড়ের অবহেলিত কৃষকগনের মাঝে চরম ক্ষোভ প্রকাশ হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের শতাধিক হাওরে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। এবার জেলার ৪০টি হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ করবে পাউবো। এ জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ১৩ কোটি ৪০ লাখ এবং ঠিকাদারের মাধ্যমে আরও ৩০ কোটি টাকার কাজ হওয়ার কথা। কাজের জন্য ২১১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। পিআইসি বিভিন্ন হাওরে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত করবে আর ঠিকাদারেরা করবেন নতুন বাঁধ তৈরি ও বাঁধ উঁচুকরণের কাজ। কাজের নির্ধারিত সময় হচ্ছে ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি।
নীতিমালা অনুযায়ী, বাঁধের কাজ তদারকের জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও স্থানীয় পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্যসচিব করে ১১ সদস্যের জেলা কমিটি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সভাপতি করে নয় সদস্যের উপজেলা কমিটি রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একজন সদস্যকে সভাপতি করে রয়েছে পিআইসি। বাঁধের কাজ করবে মূলত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। পাঁচ থেকে সাত সদস্যের প্রতিটি স্থানীয় পিআইসিতে স্থানীয় সাংসদের মনোনীত একজন নারী প্রতিনিধিসহ একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, একজন শিক্ষক ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) একজন প্রতিনিধি, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মনোনীত একজন আনসার অথবা ভিডিপি সদস্য এবং পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিনিধি একজন সদস্য কমিটিতে থাকবেন। প্রতিটি পিআইসি সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারবে। তবে কাজে কোনো অনিয়ম হলে উপজেলা কমিটির সুপারিশে নির্বাহী প্রকৌশলী পিআইসির কাজ স্থগিত অথবা বাতিল করতে পারবেন।

জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলায় ছোট বড় নির্ধারীত বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা কিন্তু স্থানিয়দের তথ্য ও স্বরজমিনে দেখা যায়, ৮টি প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই হয়নি, প্রকল্পগুলী হচ্ছে, পিআইসি নাম্বার ৭৯ এর সভাপতি শিবরামপুর গ্রামের সাফাতুল মিয়া, পিআইসি নাম্বার ৭৮ এর সভাপতি তরংগ্রামের শামছুল আলম আখঞ্জি, পিআইসি নাম্বার ৭৭ এর সভাপতি তরং গ্রামের মোঃ দেলোয়ার হোসেন, পিআইসি নাম্বার ৭৬ এর সভাপতি ছিলানী তাহিরপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম, অইআইসি নাম্বার ৯১ এর সভাপতি শিবরামপুর গ্রামের মহিবুল আলম, পিঅইসি নাম্বার ৯০ এর সভাপতি কচুয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম, পিআইসি নাম্বার ৮৯ এর সভাপতি ভাটি তাহিরপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, পিআইসি নাম্বার ২৮ এর সভাপতি রতনশ্রী গ্রামের আব্দুল জলিল। এই ৮টি পি,আই,সির প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই হয়নি, কবে নাগাদ শেষ হবে জানতে চায় স্থানিয় কৃষকগন।

বিভিন্ন তথ্য ও স্বরজমিনে গিয়ে দেখা যায় তাহিরপুর উপজেলার অনেকটি বাঁধের কাজ নাম মাত্র করা হয়েছে, কিছু কিছু বাঁধের কাজ ৪ভাগের এক ভাগ করা হয়েছে। পাউবোর নীতিমালা অনুযায়ী বোরো ফসল রক্ষা সব বাঁধেই মাটি কমপেকশনের জন্য দরমুজ করে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী মাটি কমপেকশনের জন্য প্রতি ঘনমিটারে ৩৭.৫২টাকা বরাদ্দ রয়েছে, আলাদা ভাবে কমপেকশনের বরাদ্দ থাকলেও তাহিরপুর উপজেলার কিছু কিছু বাঁধে সঠিক ভাবে মাটি কমপেকশন করছেনা। বোরো ফসল রক্ষায় অনুমোদিত প্রকল্প গুলোতে বিলম্বে কাজ শুরু করায় প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইসি) কমিটি ২৮শে ফেব্রুয়ারী কাজ শেষ করার নির্দেশনা থাকার সত্যেও কাজ শেষ করতে পারেনি।

একাধিক(পি,আই,সি)বলেন, হাওরের পাঁনি ধীর গতিতে কমার কারনে পাঁনির জন্য মাটি না পাওয়ায় বাঁধের কাজের বিলম্ব হয়েছে।

এলাকার স্থানিয় কৃষকরা জানান, উপজেলার স্থানীয় অনেক ইউপি চেয়ারম্যানদের ও রাজনৈতিক নেতাগন সম্পৃক্ত হয়ে নিজ স্বজনদের নিয়ম বহীর্ভুত ভাবেই উচু উচু যায়গা দেখে ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্প দিয়ে কাজের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফসল রক্ষা বাঁধের ঝুঁকিপুর্ণ বাঁধ গুলো রেখেই স্বজনপ্রীতি করছেন প্রকল্পের কর্তা ব্যাক্তিরা।

কৃষকদের তথ্যমতে, স্থানিয় ইউপি চেয়ারম্যান ও নেতাদের স্বজনদের দেওয়া উঁচু যায়গার মাটি অনেক আগেই শুকিয়েছে কিন্তু শেষ হয়নি বাঁধের কাজ। কিছু কিছু পিআইসিরা বাঁধের কাছ থেকেই মাটি কেটে বাঁধ নির্মান এর কাজ করছে।

‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলন কমিটির তাহিরপুর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব গোলাম সারোয়ার(লিটন)বলেন, আমরা চাই ২৮ শে ফেব্রুয়ারী মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হওয়া দূরের কথা অনেক বাধের কাজই শুরু হয়নী। বিগত বছর বাঁধ ভেঙ্গে ফসল ডুবির কষ্টের দাগ এখন মুছেনি হাওরবাসীর, ইতিমধ্যে বৃষ্টি প্রায় শুরু হয়ে গেছে, সময়মত বাঁধ না হলে বাঁধ দুর্বল হয়ে যায়। সরকারের এই চমৎকার উদ্যোগ নেওয়াতেও পিআইসিদের অবহেলার কারনে কৃষকের ফসলের ক্ষতি হলে আমরা অসহায়।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, আমরা নিজেরাও দেখিয়াছি উপজেলার বিভিন্ন বাঁধে দরমুজ করা হচ্ছে না, সরকার নির্ধারীত নিয়ম অনুযায়ী সঠিক ও শক্ত ভাবে কাজ হচ্ছে না, ইতিমধ্যে কয়েকটি বাঁধের কাজ শুরু হয়নি।
আমরা সরকারের কাছে দাবী জানাই, যেন শিঘ্রই বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয় এবং যাদের অবহেলার কারনে এগুলো হচ্ছে তাদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয়।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান কামরুজ্জাম কামরুল বলেন, আমি গতকাল হাওর এলাকা ঘুরে এসে দেখিয়াছি বর্তমানেও কয়েকটি পিআইসি কাজ শুরু করে নাই এবং কিছু কিছু পিআইসি যে ভাবে ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি কমপেকশন করার কথা সেই ভাবে হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আমি কর্তপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ব্যাবস্তা নিব।