সেই বিভীষিকাময় নাইন-ইলেভেন; কী ঘটেছিল সেদিন?

সিলেট নিউজ বিডি ডেস্ক: ইতিহাসের বিভীষিকাময় নাইন ইলেভেন আজ। ১৭ বছর আগে ২০০১ সালের এ দিনে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আত্মঘাতী বিমান হামলা চালায় জঙ্গি গোষ্ঠী আল কায়েদা।

ওই দিন জঙ্গিরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে মোট চারটি বিমান হাইজ্যাক করে ও অস্ত্রের মুখে বৈমানিকদের বাধ্য করে তাদের কথা শুনতে। এরপর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগণ ও পেনসিলভ্যানিয়ায় জোরপূর্বক বিধ্বস্ত করা হয় এসব বিমান।

এই ঘটনায় আনুমানিক ৩ হাজার মানুষ মারা যান। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৫০ জন মারা যান নিউইয়র্কে, ১৮৪ জন মারা যান পেন্টাগণে, ৪০ জন মারা যায় পেনসিলভ্যানিয়ায়। এছাড়া উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়েও প্রাণ হারান অনেকে।

সেই হামলার আশঙ্কায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে সারাদিন বিভিন্ন অজানা স্থানে রাখা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এই হামলাকে আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং ধৃষ্টতাপূর্ণ হামলা আখ্যা দেয়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল কায়দার ১৯ জঙ্গি চারটি বিমান ছিনতাই করেছিল। হিস্টোরি চ্যানেল তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সৌদি আরবে পলাতক হিসেবে নথিভুক্ত ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন আল কায়েদা এই হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতির কারণ দেখিয়ে তারা এ হামলা চালায়।

সংশ্লিষ্ট হামলাকারীদের কয়েকজন বছরখানেক আগেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিল এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানেই বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। বাকিরা হামলার কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে। আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে জড়িত জঙ্গিরা লুকিয়ে ছুরি নিয়ে উঠেছিল বিমানে।

সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৬৭ মডেলের একটি বিমান আঘাত হানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১১০ তলাবিশিষ্ট নর্থ বিল্ডিংয়ের ৮০তম তলায়। বিমানটিতে ২০ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল থাকায় খুব দ্রুতই ভবনে আগুন ধরে যায়।

নর্থ বিল্ডিংয়ে আঘাতের মাত্র ১৮ মিনিটের মাথায় আত্মঘাতী জঙ্গিদের ছিনতাই করা আরেকটি বিমান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ বিল্ডিংয়ের ৬০তম তলায় আঘাত হানে। এটিও একটি দূরপাল্লার বোয়িং ৭৬৭ বিমান। এই বিমানটি ছিল ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের।

সকাল ১০টার দিকে সাউথ বিল্ডিং এবং সাড়ে ১০টার দিকে নর্থ বিল্ডিং পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পুড়তে থাকা জেট ফুয়েলের প্রচণ্ড তাপে গলে গিয়েছিল ভবন দুটির ইস্পাতের কাঠামো। ফলে একটির ওপর একটি তলা ধসে পড়ে পুরো ভবনকেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।

টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার আগ পর্যন্ত মাত্র ছয় জন ব্যক্তি নিরাপদে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন। প্রায় ১০ হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন ওই ঘটনায়, যাদের অনেকের আঘাতই মারাত্মক ধরণের। টুইন টাওয়ার হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন মোট দুই হাজার ৭৬৩ জন।

এদের মধ্যে রয়েছেন উদ্ধার তৎপরতায় গিয়ে প্রাণ হারানো ৩৪৩ ফায়ার ব্রিগেড ও চিকিৎসা কর্মী, নিউ ইয়র্ক পুলিশের ২৩ জন এবং পোর্ট অথরিটি পুলিশের ২৩ জন সদস্য।

তদন্তে দেখা যায়, হামলাকারী ইস্ট কোস্ট অঞ্চলের বিমানবন্দর থেকে ক্যালিফোর্নিয়াগামী বিমানে উঠেছিল। ইস্ট কোস্ট থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায়, বিমানের জ্বালানিও লাগে অনেক বেশি। আল কায়েদার জঙ্গিরা জানতো, বিশাল পরিমাণ জেট ফুয়েল নিয়ে উড্ডয়ন করা বিমান ছিনতাই করতে পারলে তা দিয়ে অনেক বড় বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে। পরপর দুইটি সুউচ্চ ভবনে বিমান আছড়ে পড়ার ঘটনায় এটা সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, যুক্তরাষ্ট্র হামলার শিকার।

কিন্তু টুইন টাওয়ারের হামলাই শেষ নয়। জঙ্গিদের ছিনতাই করা আরও দুইটি বিমান তখনও আকাশে। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭৭, বোয়িং ৭৫৭, বিধ্বস্ত হয় মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনের পশ্চিম দিকে। এক্ষেত্রেও বিশাল পরিমাণ জেট ফুয়েলের কারণে বড় বিস্ফোরণ হয়। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। পেন্টাগনের ওই পাশের ভবন ধসে পড়ে। এতে প্রাণ হারান ১২৫ জন। সেই সঙ্গে মারা যায় বিমানের সব যাত্রী ও ক্রুসহ আত্মঘাতী হামলাকারীরা।

সেদিনের সেই হামলাগুলো মার্কিন জাতীয় জীবনে যে শুধু বিপর্যয়ই ডেকে এনেছিল তা নয়। বরং প্রতিরোধেরও এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল। যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে চতুর্থ বিমানটির নিয়ন্ত্রণ হারায় ছিনতাইকারী আল কায়েদার জঙ্গিরা। এটি ছিল ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৯৩। বিমানটির উড্ডয়নে দেরি হয়েছিল। আর নিউ জার্সির লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে উড্ডয়নের পার চল্লিশ মিনিট পরে সেটি ছিনতাইয়ের শিকার হয়। বিমানের যাত্রীদের অনেকেই ততক্ষণে জেনে গিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কে হামলার ঘটনার বিষয়ে। ফলে তারা যখন জানতে পারলেন তাদের বিমানও ছিনতাই হয়েছে, তখন তারা প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন।

হিস্টোরি চ্যানেল তাদের কয়েকজনের ফোন কলের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, ফ্লাইট ৯৩ এর যাত্রীরা খুব সম্ভবত ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করে ককপিটে থাকা ছিনাতিকারীদের বাধা দিয়েছিলেন। সকাল ১০টা ১০মিনিটে বিমানটি পেনসিলভানিয়ার একটি গ্রামীণ এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, এই বিমানটি নিয়ে জঙ্গিরা হয়তো হোয়াইট হাউজ, মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিড বা পারমাণবিক কোনও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ওই বিমানে থাকা ৪৪ জনই প্রাণ হারান।

এই হামলার জন্য দায়ী করা হয় আল কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে। তাকে এবং আল কায়েদার বাকিদের ধরতে সারাবিশ্বে সন্ত্রাস ও ইসলামি জঙ্গি দমন অভিযানে নামে যুক্তরাষ্ট্র। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে হত্যা করে মার্কিন বিশেষ বাহিনী নেভি সিল৷

আল কায়েদা অনেকটা দুর্বল হলেও বিশ্ব জুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে একাধিক জঙ্গি সংগঠন। আফ্রিকায় আছে বোকো হারাম, ইরাকের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ আর ইরাকে নুরি আল মালিকির সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদের সঙ্গেও রয়েছে ইসলামি মৌলবাদী কর্মীরা।

১৭ বছর আগে নিহত, আহত এবং তাদের স্বজনের প্রতি মঙ্গলবার শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানাবে যুক্তরাষ্ট্র। নিউ ইয়র্কের দ্য ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ইলেভেন মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে এ আয়োজন করা হবে৷