হেলাল আহমদ, ছাতকঃ শারিরিক প্রতিবন্ধি মোশাহিদ আলী একজন সহজ-সরল মানুষ। অভাব-অনটন তাকে যেন চারদিকে ঘিরে ফেলেছে। আঁকড়ে ধরে আছে তাকে অসহায়ত্বের জীবন। মানুষের অবহেলার পাত্র হয়েও থেমে নেই মোশাহিদ। অদম্য সাহস নিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য এক ধরণের জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের মাঞ্জিহারা (আলমপুর) গ্রামের মৃত শরিয়তুল্লাহর পুত্র শারিরিক প্রতিবন্ধি মোশাহিদ আলীর বয়স এখন একান্নতে। গোলাকার মুখ মন্ডলের শ্যামলা চেহারাটা আগের চেয়ে মলীন হয়ে গেছে। চামড়াও ধরেছে ভাজ। শারিরিক উচ্চতা তার ৩ফুট ৭ ইঞ্জি। দুই পুত্র ও এক কন্যার জনক শারিরিক প্রতিবন্ধি মোশাহিদ আলী পরিবারের অভাব মেটাতে বিভিন্ন ভাবে কাজ-কাম করে যাচ্ছেন। তারপরও অভাব তার পিছু ছাড়ছে না। রোজগারের টাকায় সংসারও চলছে না। এক সময় মাত্র সাড়ে ৭ শত টাকা বেতনে উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের বুড়াইরগাঁও বাজার পোষ্ট অফিসে পিয়নের কাজ করেছিলেন। চাকুরিটি অবস্থায়ি থাকায় জনৈক এক ব্যক্তির সাথে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন এবং বিভিন্ন স্থানে চাকুরি খোঁজতে থাকেন। শিক্ষাগত যোগ্যতাও তেমন নেই, শারিরিক প্রতিবন্ধি (খাটো-বাট্রি) হওয়ায় সহজে কেউ তাকে চাকুরি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। ক’বছর ধরে তিনি ছাতক সাব-রেজিস্টারের একজন মহরিরের সহকারি হিসেবে কাজ করে আসছেন। তাও সপ্তাহে মাত্র দু’দিন। এ কাজ করে ৫/৭ শত টাকা রোজগার করে কোনমতে পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দেন। অন্যান্য দিনগুলো বেকার সময় পার করতে হয় তাকে। এ কাজটি পেতে তার দীর্ঘদিন অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। ৩ ভাই ও এক বোনের মধ্যে মোশাহিদ আলীর মতো ইব্রাহিম আলী নামের তার আরেক বড় ভাই শারিরিক ভাবে খাটো ছিলেন। বারো বছর বয়সে ইব্রাহিম আলী রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যান। পারিবারিক জীবনে একই বাড়ির চাচাতো বোন আলেস্থা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন শারিরিক প্রতিবন্ধি মোশাহিদ আলী। সন্তান জন্ম নেওয়ার সময় স্ত্রী-সন্তান দু’জন মারা যায়।
পরে ছাতক সদর ইউনিয়নের মাছুখালী গ্রামের বেগম বাহারকে বিয়ে করে আবার সংসার শুরু করেন। বেগম বাহার উচ্চতায় প্রায় সাড়ে ৪ফুট। বর্তমানে তারা দুই পুত্র এক কন্যা সন্তানের জনক-জননী। বড় ছেলে সাদিক হোসেন (১৬) অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখা-পড়া করে এখন কৃষিক্ষেতে মন দিয়েছে। সাহেদা আক্তার মুন্নি (৭) স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শেণিতে লেখা-পড়া করছে। সব ছোট সাব্বির হোসেনের বয়স এখন সাড়ে ৩ বছর। তবে সন্তানরা শারিরিক প্রতিবন্ধি নয়। সম্প্রতি উত্তর খুরমা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১নং ওয়ার্ডে সদস্য পদে প্রতিদ্বদ্বিতা করেন এ মোশাহিদ আলী। ওয়ার্ডবাসীও তাকে উৎসাহ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী করেছিলেন। অবশেষে মাত্র পনের ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজয় বরণ করেন।
মোশাহিদ আলী বলেন, শারিরিক প্রতিবন্ধি (খাটো-বাট্রি) হওয়ায় চার পাশের মানুষ তাকে অবহেলা করে আসছে। এতে মাঝে মধ্যে তার মন খারাপও হয়। সংসারের অভাবও তার পিছু ছাড়ছে না। সাব-রেজিস্টার অফিসে সপ্তাহে দুই দিন দায়িত্ব পালনে যা রোজগার হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বড় অসহায় হিসেবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সম্প্রতি তিনি দেনা করে হাল চাষের জন্য দু’টি গরু ক্রয় করেছেন। নিজে হাল-চাষ করতে না পারায় এবং অভাবের কারণে তার বড় ছেলেকে লেখা-পড়া বাদ দিয়ে কৃষি ক্ষেতে নামিয়েছেন। নিজের জমি-জমা না থাকায় অন্যের তিন কেদার জমিতে চাষাবাদ করে এবার ধান লাগিয়েছেন। মোশাহিদ আলী তার এই মানবেতর-জীবন যাপন থেকে রেহাই পেতে সরকার ও জনসেবামুলক সংস্থাদের প্রতি সাহায্য এবং সহযোগিতা কামনা করেছেন।
Sylhetnewsbd Online News Paper