বড়লেখায় সরষে ফুলে মৌ চাষ করে স্বাবলম্বী জসিম উদ্দিন

মস্তফা উদ্দিনঃ কর্মপ্রচেষ্টা,ধৈর্য আর সততার সঙ্গে ৩ বছর ধরে মৌ চাষ করে আসছেন মো.জসিম উদ্দিন। মৌ চাষ করে বছরে আয় করছেন দু’ই লক্ষ টাকার মত। তার সংগৃহীত মধু এলাকার চাহিদা মিটিয়েও যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সরিষা ফুলের মধুতে ভরছে জসিম উদ্দিনের মধুর ভান্ডার। বছরের ৬ মাস ব্যস্ত থাকেন মধু সংগ্রহে।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশ ও জাতির কল্যাণে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে মৌ চাষে একটি সফল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে বলে জানান জসিম উদ্দিন।

তার খামারের মৌমাছিরা শুধু মধুই দিচ্ছে না, সরষের এক ফুল থেকে অন্য ফুলে গিয়ে পরাগায়ন ঘটিয়ে আশপাশের সরিষাখেতের উৎপাদনও বাড়িয়ে দিচ্ছে ১৮/২০ শতাংশ।

তিন বছর আগে নিজ উদ্যোগে দু’টি বাক্স নিয়ে মৌ চাষ শুরু করেন। আজ তার খামারে ১৫ টি বাক্সে চলছে মৌ চাষ। সরিষা, লিচু, কুল ও আম-কাঁঠালের মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মৌ চাষ করেন জসিম উদ্দিন।

মৌ চাষে ভাগ্য বদলে দিয়েছ জসিম উদ্দিনের। এখন তার পরিবারে ফিরেছে সচ্ছলতা। তার সাফল্য দেখে মৌ চাষের খামার করার আগ্রহ বাড়ছে বেকার যুবকদের।

জসিম উদ্দিনের বাড়ি সিলেট জেলার গোলাপগন্জ উপজেলার আমুড়া গ্রামে।গ্রামে বসত ভিটা থাকলে ও নেইকোন ঘর।অভাবের সংসার, পড়াশোনা শেষে চাকরি নেন সিলেটের বাঘ বাড়ির একটি কৌমি মাদ্রাসায়, স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকেন সেখানে। তিনি তার মৌমাছিদের নিয়ে ঘুড়ে বেড়ান পার্শবর্ত্তী উপজেলার বিভিন্ন স্হানে। বর্তমানে তিনি বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওর পারের বর্নী ইউনিয়নের কাজিরবন্দ এলাকার মালাম বিলের উত্তরে একটি সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছিদের নিয়ে অবস্থান করছেন।

জসিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে গেলো নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘কাজের লোক’ কবিতার চারটি লাইন ‘মৌমাছি, মৌমাছি, কোথা যাও নাচি, নাচি, দাঁড়াও না একবার ভাই। ওই ফুল ফোটে বনে যাই মধু আহরণে দাঁড়াবার সময়তো নাই’।

কথা হয় জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথমদিকে প্রচুর হতাশা কাজ করতো। অনেকের সাথে কথা বলে কোন সহযোগীতা পাইনি।কিন্তু প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার এক বছরের মধ্যই ঘুরে দাঁড়ায় জীবন চলার পথ। সেই পথের বাহন এখন মৌমাছির মতো ক্ষুদে একটি প্রাণী। এ পেশায় আমি খুশি ও স্বাবলম্বী।

জানালেন তার মৌ চাষ শুরু করার কথা। তিনি বলেন, আমি কৌমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। ছোট বেলা থেকে চাকরির প্রতি আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না। অভাবের সংসার। ভাবতাম নিজেই কিছু করবো। নিম্নবিত্ত পরিবার তাই অল্প বেতনে মাদ্রাসায় চাকুরী শুরুকরি। ৪/৫ হাজার টাকা মাসিক বেতনে সংসার চালানো দায়। বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক ধরনের উদ্যোক্তার কথাশুনে ভাবলাম নিজেই একজন উদ্যোক্তা হবো।

তাই আমি তিন বছর আগে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) সিলেট হতে হাতে-কলমে মৌ চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমে বিশ হাজার টাকা আর দু’টি বাক্সে নিয়ে মধু চাষ শুরুকরি।ওই সময় প্রতিবেশীরা অনেক উপহাস করেছেন। প্রথম বছর লাভমান হতে পারিনি,পরের বছর থেকে পিছনে থাকাতে হয়নি। আজ আমার খামের ১৫ টি বাক্স রয়েছে। প্রতিটি বাক্সসে ১৫ টি রাণী সহ ১৫০টি চাক রয়েছে। এখন আমার প্রায় দেড় লক্ষ টাকার পূজিও রয়েছে। খামারে উৎপাদিত মধু এলাকার চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।প্রতিবছরের ডিসেম্বর হতে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সরিষা, বরই, লিচু, আম-কাঁঠালের মৌসুমে ফুলথাকায় প্রতি সপ্তাহে একেক টি বক্স থেকে ৪/৫ কেজি করে মধু সংগ্রহ করা যায়।

এখন অামার কাছথেকে অনেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মৌ চাষের। এ পর্যন্ত সরকারি কোন সহযোগিতা পাইনি।যারা হাওর অঞ্চলে সরিষা আবাদ করে সেসব প্রান্তিক কৃষকই বিষয়টি বোঝেন না। সব কৃষককে এ ব্যাপারে সরকারি ভাবে মাঠ পর্যায়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের উৎপাদিত মধু বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।

মাঠে দেখা হয় বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবল সরকারের সাথে, এসময় তিনি বলেন, বড়লেখার হাকালুকি হাওর এলাকায় অনেক সরিষা আবাদ করা হয়। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। সরিষার খেতে মৌমাছি ফুলের ওপর বসলে ফুলের পরাগায়নের ফলে ফসলের পুষ্টি বৃদ্ধি হয়। এতে সরিষার ফলন ১৮/২০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। শুধু সরিষাই নয়, মৌমাছিরা ফুলের পরাগায়ন ঘটিয়ে নানা ধরনের রবিশস্যের ফলন বৃদ্ধি করে।তাছাড়া এখানে কোনও মৌ চাষি নেই।তাই এখানে মৌ চাষ উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। চলতি মৌসুমে ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় উপজেলার কাজীর বন্দ এলাকায় উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগে দুজন মৌচাষি এনে সরিষা-ক্ষেতের পাশে মৌ চাষের ব্যবস্থা করা হয়। মৌ চাষি জসীম উদ্দিন ও আব্দুল গণি সরিষা ক্ষেতের পাশে ৫২ টি মৌ বাক্স স্থাপন করেন। উপজেলা কৃষি অফিস তাদেরকে সহায়তা করে। আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া গেছে। মৌ চাষের কারণে একদিকে যেমন সরিষা উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে অল্প খরচে মৌ চাষ করে দূর হবে বেকারত্ব। আগামী মৌসুমে শতাধিক মৌ বক্স বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।