দ্বৈতভর্তি জরিমানা বাতিল ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড ইস্যুর দাবিতে শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন

সিলেট নিউজ বিডি ডেস্ক: দ্বৈতভর্তি জরিমানা বাতিল ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড ইস্যুর দাবিতে রবিবার ১০ জুন বিকাল ৩.৩০টায় সিলেট শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী তাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রিয়াংকা রায়, আবু হুরায়রা লিমন, সানজিদা আক্তার প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তাজুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য নিম্মে হুবহু তুলে দরা হল:

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বৈত ভর্তির ভূক্তভোগী ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা জানবেন। সারাদেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হুমকির পড়েছে ২০জুন’১৮ তারিখে জাতীয় বিশ্বববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তি জারির ফলে। সেখানে বলা হয়েছে দ্বৈতভর্তি সম্পূর্ণ আইন বা নিয়ম বহির্ভূত। গতবছর যারা ভর্তিকৃত বিষয়ে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে তা বাতিল না করে পুনরায় নতুন বিষয়ে ভর্তি হয়েছে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর শাস্তি হিসেবে প্রথম বর্ষ ভর্তি বাতিলের জরিমানা ১০০০০/-(যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে) এবং যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি তাদের জরিমানা ৭৫০০/-। এর বাইরে ভর্তি বাতিল ফি ৭০০/- উভয়কেই দিতে হবে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বক্তব্যে সত্য প্রতিফলিত হয়নি।

কারণ ভূক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে যে সকল বিষয়ে ভর্তি হয়েছে তা তাদের পছন্দের বিষয় ছিলো না। কিন্তু বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা ভর্তি হয়েছিলো। অনেকে আবার আর একটু ভালো কলেজে ভর্তি হতে চায় কিন্তু পছন্দের কলেজ পায়নি। তারাই ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্ষিয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে পছন্দের বিষয় এবং কলেজে ভর্তি হয়েছে। এই ভর্তিতে এসএসসি ও এইচসসির মূল কাগজপত্র লাগে। আর কলেজ লিখিত প্রমাণ ও নির্দিষ্ট ফি ছাড়া কোনভাবেই মূল নম্বরপত্র শিক্ষার্থীদের হাতে দেয়না। তাই শিক্ষার্থীদের যথা নিয়মে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ফরমে ভর্তি বাতিলের আবেদনপত্র এবং ১০২০ টাকা বাতিল ফি জমা দিয়ে তাদের মূল কাগজপত্র পূর্বের কলেজ বা ডিপার্টমেন্ট থেকে উত্তোলন করে পরবর্তী চান্স পাওয়া কলেজে/বিষয়ে ভর্তি হতে হয়। এখন ফি প্রদানপূর্বক ভর্তি বাতিলের লিখিত আবেদন করলেও যদি সেই কলেজ বা ডিপার্টমেন্ট তাদের প্রয়োজনীয় কর্তব্য সম্পাদন করে ভর্তি বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ না করে, সে দায় কি শিক্ষার্থীদের ? তার শাস্তি হিসেবে শিক্ষার্থীদের উপর এই বিশাল জরিমানার বোঝা চাপানো কি নৈতিক হয়?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বর্ষ ভর্তি নির্দেশিকাতে উল্লেখ আছে কোন প্রার্থী একই শিক্ষাবর্ষে দ্বৈত ভর্তি হলে তার ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিলো এবং পরবরর্তীতে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় আবেদন করে সঠিক প্রক্রিয়ায় ভর্তি হয়েছে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নির্দেশিকা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের উপর যে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে তা অযৌক্তিক।

আবার বলা হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন দ্বারা পরিচালিত, সমস্ত কিছু ডিজিটাল। তাহলে একজন ছাত্র যখন দ্বিতীয়বার ভর্তি হচ্ছে তখনই তাকে বলা যেত যে তুমি দ্বৈত ভর্তির মধ্যে পড়েছো, আগে পূর্বের ভর্তি বাতিল কর। কর্তৃপক্ষ কেন তা বাতিল করলেন না। এর উদ্দেশ্য কি ছিল? আর একই প্রক্রিয়ায় ছাত্ররা যখন দ্বিতীয়বার ভর্তি হচ্ছে তখন তার পূর্বের ভর্তি তো অটো বাতিল হওয়ার কথা। এ দায় কার ? বাস্তবে কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায় শিক্ষার্থীদের উপর চাপাচ্ছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় বলছে যে, শিক্ষার্থীরা ২০১৭ সালে ভর্তি বাতিলের আবেদন করলেও কলেজ সেই আবেদন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়নি। ভর্তি বাতিলের ফিসহ আবেদনপত্র কলেজই জমা রেখেছে। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে জরিমানা কলেজকেই করা উচিত নয় কি?

এই সকল বিষয় যুক্তি সহকারে তুলে ধরার জন্য ভূক্তভোগী শিক্ষার্থীরা প্রায় ২০দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যুক্তি আমলে না নিয়ে একতরফাভাবে তাদেরকে দোষরোপ করছে। বিষয়টি তদন্ত না করে ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনকে অযৌক্তিক বলছে। এটা কোন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শোভন নয়। শিক্ষার্থীরা যে ২০১৭ সালে ভর্তি বাতিলের আবেদন করেছিলো তার কিছু ডকুমেন্ট আমাদের কাছে আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৬ জুন ২০১৮ এক বিজ্ঞপ্তিতে আবার বলে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতক(পাস) কোর্সের ভর্তিকৃত যে সকল শিক্ষার্থী ইতিপূর্বে ঘোষিত নির্ধারিত সময়ে (১৬/০৫/২০১৮ পর্যন্ত) ভর্তি বাতিলের আবেদন করেছে এবং সে মতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেসব শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিলের চিঠি প্রেরণ করেছে কিন্তু অদ্যাবধি ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) কোর্সের রেজিস্ট্রেশন কার্ড পায়নি, তাদের আগামী ১০/০৬/২০১৮ তারিখের মধ্যে পর্যায়ক্রমে স্ব-স্ব কলেজ থেকে ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) কোর্সের রেজিস্ট্রেশন কার্ড সংগ্রহ করতে বলা হলো। নতুন করে তাদের আর আবেদন করতে হবে না। একথা যদি সত্য হয় তাহলে ভূক্তভোগী সকল শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন কার্ড ১০ জুনের মধ্যেই আসার কথা। কারণ ২০১৭ সালেই প্রত্যেকেই এরা ১০২০ টাকা ফি জমা দিয়ে ভর্তি বাতিলের আবেদন করেছিল। এই নোটিশের প্রেক্ষিতে অনেক কলেজ আবার ছাত্রদের করা আবেদন পত্রের তারিখ পরিবর্তন করে তাদেরকে জরিমানার আওতায় ফেলার চক্রান্ত করেছে। তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রধান ধারা। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এখান থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এখানে শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক অভিভাবকের মত হওয়া উচিৎ। কোন ভুল হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের আচরণ স্বেচ্ছাচারী। কোন কাজ অবৈধ হলে,তা অবৈধই, কিন্তু টাকা দিলেই তা বৈধ হয়ে যায় এ কেমন নিয়ম। এটাতো নীতি নৈতিকতার চরম লংঘন। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব অনৈতিক কাজ করতে পারেনা। তাহলে শিক্ষার নীতিগত ভিত্তিই দূর্বল হয়ে যায়। আর যে অন্যায় শিক্ষার্থীরা করেনি তার জন্য তাদেরকে জরিমানা না করে খোলা মন নিয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য তদন্ত করা উচিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আমাদের শিক্ষাজীবন আজ চরম হুমকির মুখে। জরিমানা আদায়ের এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী হলে অনেক শিক্ষার্থী টাকা যোগাড় করতে না পেরে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়বে।বাবা-মায়ের স্বপ্ন ও শিক্ষার্থীদের সাধনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি অনৈতিক ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নজির স্থাপন করবে। আপনাদের মাধ্যমে আমরা আমাদের যুক্তি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তুলে ধরলাম। আমরা আপনাদের মাধ্যমে সর্বস্তরের বিবেকবান মানুষেরও সমর্থন চাই। ১২ জুনের মধ্যে এই বিষয়ে আমরা সমাধান চাই। নিম্নোক্ত দাবির বাস্তবায়ন চাই।

দাবিসমূহঃ
১। জরিমানা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করতে হবে। ফরম পূরণের শেষ তারিখ কলেজ খোলার পর ১৫ দিন বাড়াতে হবে এবং এই সময়ের মধ্যে ভূক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সকলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি বহাল রাখতে হবে।

৩। দ্বৈত ভর্তির ক্ষেত্রে প্রথম ভর্তির জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদানকৃত ভর্তি ফি শিক্ষার্থীদের ফেরত দিতে হবে।

৪। কলেজ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

দাবি পূরণে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ দিনের আল্টিমেটাম দিচ্ছি। এ সময়ের মধ্যে জরিমানা বাতিলসহ অন্যান্য বিষয় সুরাহা না হলে ধর্মঘট,আমরণ অনশন,হাইকোর্টে রিটসহ কঠোরতম কর্মসূচি পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।