হাসান মো.শামীম: চৌহাট্টাস্থ সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের সামনে এক যুবক লিফলেট বিলি করছেন। কলেজের সামনে এরকম হরহামেশাই লিফলেট বিলি করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোক। এই লিফলেটগুলোর বেশিরভাগই হয় শিক্ষা সম্পর্কিত অথবা কোন কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন। ফলে এখানে যে লিফলেটই বিলি করা হয়না কেন মানুষজন তা হাতে নেন। তবে ওই যুবকের হাতে থাকা বিজ্ঞাপনটি একটু ভিন্ন ধরনের। আসন্ন ভালবাসা দিবস উপলক্ষে এই বিজ্ঞাপনটি পুরোটাই ভালবাসা সংক্রান্ত। দক্ষিন সুরমার সিলাম রিজেন্ট পার্কের ভ্যালেন্টাইনস ডে অফার। দেখা গেল লিফলেট বিতরনরত যুবকটি নির্দিষ্ট কিছু বয়সী ছেলে ও মেয়েকে এই লিফলেটি দিচ্ছেন। বয়স্ক কোন পথচলতি মানুষ তার লিফলেট পাচ্ছেন না। কলেজ থেকে বের হয়ে আসা মেয়ে শিক্ষার্থী এবং ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতরত তরুনরাই শুধু পাচ্ছেন ওই লিফলেট। যাকেই দেওয়া হচ্ছে তিনিই হাতে নিচ্ছেন লিফলেটটি। দেখা গেল লিফলেট নিয়ে অনেক ছেলেদের মুখে হাসি আর মেয়েদের বিব্রত মুখ। আদতে কি ছিলো ওই লিফলেটে? অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
রঙ্গিন লিফল টিতে ভালবাসা ও বসন্ত দিবসের যুগলবন্দি অফার। নানা আয়োজনে দুটি উঠসব রাঙ্গিয়ে দেয়ার সকল আয়োজন চুড়ান্ত। মিউজিক র্যাফেল ড্র ফটোশুট সুসজ্জিত প্যান্ডেল এ পর্যন্ত সব কিছুই ঠিক ছিলো। তবে চোখ আটকে যায় আরেকটি বিশেষ অফারে। হানিমুন কটেজ আর কাপল লাঞ্চ। কৌতুহলী মন জানতে চায় ভালবাসা দিবসে হানিমুন কটেজ আদতে কি ইঙ্গিত বহন করে। আলাদা করেই বা কেন কাপল লাঞ্চ লেখা।
লিফলেটটিতে দেওয়া একটি মোবাইল নাম্বারে ক্রেতা সেজে কল করা হয়। ফোন ধরেন রিসোর্টটির সেকেন্ড ম্যানেজার ফরহাদ। তিনি জানান কাপলদের জন্য ভালবাসা দিবসে তাদের বিশেষ অফার চার হাজার টাকায় ডিলাক্স রুম। এই প্রতিবেদক তখন তাকে জানান তিনি তার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে হানিমুন সুইটে আসতে চান, কোণ সমস্যা হবে কিনা। সেকেন্ড ম্যানেজার ফরহাদ জানান আপনি আসেন স্যার কোন সমস্যা হবেনা ! আপনারা যেখানে থাকবেন সেখানে অন্য কারো প্রবেশের সুযোগ নেই। এ সময় দুজনের জাতীয় পরিচয় পত্র দেখাতে হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন একজনের দেখালেই চলবে। এরপর তিনহাজার টাকায় একটি ডিলাক্স রুম বুকিং নিয়ে তিনি একটি বিকাশ নাম্বার দেন এবং তাতে পাচশ টাকা পাঠাতে বলেন।ফরহাদ জানান অগ্রীম বুকিং পাঠালে তার জন্য রুম রেডি থাকবে। গাড়ি নিয়ে আসলে ফ্রি গাড়ী পার্কিংয়ের ও ব্যবস্থা থাকবে। এই প্রতিবেদক তার নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইলে ফরহাদ বার বার তাকে আশ্বস্ত করেন পুর্ন নিরাপত্তা নিয়ে। বলেন স্যার আমাদের সিসি ক্যামেরা আছে, আর এখানে ভালবাসা দিবস এনজয় করতে অনেকেই বুকিং দিয়েছেন, আপনার চিন্তার কিছু নেই।
অথচ অনলাইন ঘেটে এই বিশেষ অফারটির কোন হদিস মেলেনি। এমনকি এই বিশেষ লিফলেট কিংবা এই অফার সম্পর্কিত কোন তথ্য নেই রিজেন্ট পার্কের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজে। ধারনা করা যায় অফারের বিশেষ গলদটি ঢাকতেই কিছুটা চুপিসারেই এই বিজ্ঞাপন চালাচ্ছেন সংশ্লীষ্ট কর্তৃপক্ষ। অনুসন্ধানে জানা গেছে সিলেট শহরতলী ও এর আশেপাশে থাকা প্রায় সবগুলো রিসোর্টের অবস্থা একই রকম। অবাধে এখানে চলছে নানা ধরনের অনৈতিক অসামাজিক কার্যকলাপ। অথচ স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে রহস্যজনক কারনে উদাসীন। নানা দিবস এর উপলক্ষে এখানে চলে নানা আয়োজন। একসময় শুধু থার্টিফার্স্ট প্রোগামেই উন্মাতাল হত সিলেট তথা পুরো বাংলাদেশ। কিন্তু থার্টিফার্স্টে প্রশাসনের কড়া নজরদারির কারনে গত কয়েকবছর ধরে হচ্ছেনা উন্মাতাল কোণ আয়োজন। ফলে ভ্যালেন্টাইনস ডে বসন্ত উঠসব এসবের মোড়কে এখন চলছে নান অপকর্ম। আকারে ইঙ্গিতে কম বয়সী তরুণ তরুণীদের নানা সুযোগের কথা বলে আকৃষ্ট করা হচ্ছে অসামাজিক কার্যকলাপে। আর এসব নিরাপদ অফারের আকর্ষনে ঘটছে নানা সামাজিক অবক্ষয়। বিপর্যস্ত হচ্ছেন অনেক ভাল পরিবারের মেয়ে। হানিমুন স্যুইট যার একটি উদাহরন মাত্র।
আদতে সিলেটে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন অসংখ্য রিসোর্ট ও ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান। আর এসব রিসোর্ট ও ট্যুরিজম ব্যবসায়ীদের কারণে লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। আবার অবৈধ রিসোর্ট ও ট্যুরিজম ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে নানা দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে পর্যটকদের। অনেক সময় স্থানীয়রাও বাদ যায় না হয়রানির কবল থেকে। অবৈধ ভাবে গড়ে ওঠা এসব ট্যুরিজম ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের হোটেল-মোটেল জোন ও শতাধিক রিসোর্ট ও ট্যুরিজম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেগুলোর অধিকাংশরই নেই কোন ট্রেড লাইসেন্স এভং ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব সিলেট (ট্যুয়াস) এর অনুমোদন। এসব রিসোর্ট ট্যুরিজম প্রতিষ্টান গড়ে উঠেছে কোন শহর ও শহরের আসে পাশে। এদের কোন স্থায়ীত্ত ও নেই। অনেক সময় পর্যটক কিংবা স্থানীয়দের বুকিং নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। নানা সময় পর্যটকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে রিসোর্টে এনে বিব্রতকর অবস্থায় নানা অন্যায় সুযোগ নেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে রিজেন্ট পার্ক রিসোর্টের পাশের গ্রাম জালাল্পুরের বাসিন্দা যুবলিগ নেতা ফারুক বিষয়টি জেনে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন জালালপুর তথা পুরো সিলাম ইউলিয়নের সারাদেশেই একটি আধ্নাত্যিক সুনাম আছে। এখানকার মানুষ ধর্মভীরু অমায়িক। এই পবিত্র স্থানটিতে কোন অপকর্ম সাধিত হলে তা হবে দুঃখজনক। যা এখানকার মানুষ শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবে।
Sylhetnewsbd Online News Paper