হাসান মো.শামীম:
সিলেট শহরে ইদানিং বেড়ে গেছে ছিনতাই ও মাদক সেবন। বিপথগামী অনেক তরুণ নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে পা বাড়াচ্ছে নানা অনৈতিক কাজে। এজন্য ছিনতাইয়ের প্রকোপ হচ্ছে বেশি। ভদ্রবেশি শিক্ষিত তরুণদের পাশাপাশি ভবঘুরে বখাটেরা অস্থির করে রেখেছে সামাজিক পরিবেশ। নানা কৌশলে ছিনতাই করছে ছিনতাইকারীরা। ভিন্ন ভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ ধরা পরছেন ছিনতাইকারিদের পাতা ফাঁদে। কাজে দিচ্ছেনা নগরীর বিভিন্ন মোড়ে লাগানো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাগুলোও। সাধারন মানুষের জন্য আতংক হয়ে দাড়িয়েছে নম্বরবিহীন মোটর বাইক আর হেলমেটধারী চালকগণ। নিজেদের সিসি ক্যামেরা থেকে সুরক্ষিত করতে হেলমেটের আড়ালে ইদানিং চালানো হচ্ছে বেশিরভাগ ছিনতাই। আর এসব কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে নম্বরবিহীন মোটর সাইকেল। ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রে নগরীর স্থায়ী বাসিন্দার পাশাপাশি টার্গেট হয়ে দাড়িয়েছেন সিলেটে আগত বিভিন্ন জেলার পর্যটকগন। শহর সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার সুযোগে প্রতারনা ও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন তারা। বিশেষত রেল স্টেশন ও বাস টার্মিনাল থেকে নেমে শহরে প্রবেশের মুখে অনেক যাত্রী ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। যদিও ক্বীন ব্রিজ সংলগ্ন সুরমা পাড়ের পুরো এলাকাই ছিনতাইয়ের ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে। আধ্যাতিœক নগরী সিলেটকে ছিনতাই সন্ত্রাসের রাহু গ্রাস থেকে মুক্ত করতে এবার আটঘাট বেধে মাঠে নেমেছে পুলিশ প্রশাসন। গঠন করা হয়েছে বিশেষ টিম। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি ও প্রসিকিউসন) এর তত্ত্বাবধানে ছিনতাই প্রতিরোধের জন্য নগরের বিভিন্ন স্থানে ডিবি পুলিশের ষোল (১৬) টি টিম কাজ করছে। এ ব্যাপারে সাধারন জনগনের সহায়তার জন্য দেওয়া হয়েছে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের বিশেষ নাম্বার। এছাড়া ৯৯৯ নাম্বার তো খোলা আছেই। পুলিশের এমন উদ্যোগ জনমনে প্রশংসা কুড়াচ্ছে বেশ। ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে কাজ করা পুলিশের এই ১৬ টি দল চষে বেড়াচ্ছে নগরীর সর্বত্র। ফলও মিলছে দারুন। ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি কালে যেমন ধরা হচ্ছে ছিনতাইকারীদের ,তেমনি ছিনতাইয়ের কিছু পরেই পুলিশের জালে বমাল সহ ধরা পরছে অপরাধীরা। নগরীর চিহিত মাদক স্পট গুলোতেও ধর পাকড় চালাচ্ছে পুলিশ। দীর্ঘদিন থেকে এসব জায়গায় ওপেন সিক্রেট মাদক ব্যবসা চললেও এতদিন যেনো দেখেও দেখেনি কেউ। তবে এবার ছাড় পাচ্ছেন না কেউ।
দীর্ঘদিন থেকে চোলাই মদ আর গাজার ওপেন স্পট ছিল দক্ষিন সুরমা এলাকার ভার্থখলা এলাকার নদীর পাড়। নিম্নশ্রেনীর পেশাজীবী সুইপারদের কলোনীতে বিক্রি হত নানা ধরনের মাদক। সুইপারদের ব্যাপারে প্রশাসনের ছাড় থাকলেও এর সুযোগে নগরীর তরুন সমাজ ভীড় জমাতো এসব স্থানে। মাদক সহজ লভ্য হওয়াতে এবং স্থান নিরাপদ হওয়ায় এখানে বসে চলতো বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন। ব্যাপারটি স্থানীয় এলাকাবাসীর জানা থাকলেও প্রতিবাদ করেএ ব্যাপারে ঝামেলায় যেতে চাননি কেউ। ফলে সবার চোখের সামনেই চলছিল এই অবৈধ ব্যবসা। সম্প্রতি সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে দক্ষিণ সুরমা থেকে ১০০ লিটার চোলাই মদ ও এক কেজি গাঁজাসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে দক্ষিণ সুরমা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
এ ব্যাপারে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মাহাবুর আলম মন্ডল জানান, ‘আটক ব্যক্তিরা কৌশলে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে চোলাই মদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া এলাকা থেকে গাঁজা এনে সিলেট শহরে বিক্রি করত। দীর্ঘ দিন ধরেই মাদক কেনাবেচার জন্য তারা দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা এলাকার নদীর পাড় এলাকাকে ব্যবহার করত। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে চোলাই মদ ও গাঁজাসহ ৪ জনকে আটক করে’।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সঞ্জয় সরকার জানান, ‘গোয়েন্দা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ভার্থখলায় এই অভিযান চালায় তারা’।
প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ভার্থখলার ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদ বলেন “সুরমার এই পাড়ের মানুষজন সহজ সরল জীবন যাপন করতে চান। এই ভার্থখলা এলাকায় তাবলিগের সবচেয়ে বড় জমায়েত হয়। প্রশাসন এভাবে অভিযান অব্যাহত রাখলে মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে আমরা এগিয়ে যাব”।
জানা গেছে এসব জায়গায় মাদক সেবন করে ছিনতাইয়ে লিপ্ত হয় মাদকসেবীরা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মানুষজন প্রথমে এসে পা রাখেন সিলেট রেলওয়ে স্টেশন কিংবা বাস টার্মিনালে। এরপর যানবাহন কিংবা রিকশা যোগে ক্বীন ব্রিজ হয়ে প্রবেশ করেন শহরের দিকে। এই স্থানটি তাই ছিনতাইকারীদের জন্য হয়ে উঠেছিল স্বর্গরাজ্য। বিভিন্ন ধরনের দেশিয় অস্ত্র দেখিয়ে ছিনতাই করা হত পর্যটকদের মালামাল। ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে গত বছর ক্বীন ব্রিজের উপরে খুন হোন শাবি এক শিক্ষার্থী। এছাড়া নানা সময় এই এলাকায় ছিনতাই ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। চলতি সপ্তাহে ক্বীনব্রীজ এলাকা থেকে ছিনতাই করে পালানোর সময় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দুলাল নামের এক ছিনতাইকারীকে আটক করে। বন্দরবাজার থেকে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে যাওয়ার পথে ক্বীনব্রীজে উঠার মুখে উক্ত
ছিনতাইকারীসহ আরো ২জন ছিনতাইকারী সাথী আক্তার নামের এক মহিলার ভ্যানেটি ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। এসময় ডিউটিরত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এমসআই মো. আব্দুল হান্নান ও তার সঙ্গীয় ফোর্সের সহায়তায় উক্ত ছিনতাইকারীকে ধাওয়া করে ক্বীনব্রীজের দক্ষিণ পাশ থেকে আটক করে। তবে তার সঙ্গীয় দুই ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়। আটক ছিনতাইকারীর কাছ থেকে ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত একটি ধারালো চাকু ও খুরসহ ভিকটিম সাথী আক্তারের ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন ও ১০০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নগরীর কুয়ারপাড় এলাকা থেকে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে তিন কিশোরকে আটক করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গত মাসেই সিলেটের ডিসি উত্তর শেখ মো: আজবাহার এর নেতৃতে সিলেট নগরীর পুরাতন মেডিকেল এলাকার কলোনি থেকে পুলিশের বিশেষ অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী চক্রের চার শীর্ষ নেতাকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা দীর্ঘদিন থেকে নগরীর বিভিন্ন যায়গায় ছিনতাই ও চুরি সহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড করে আসছে।
Sylhetnewsbd Online News Paper