টাংগুয়ার হাওরে কমে যাচ্ছে অতিথি পাখির আগমন: কার্যকরী উদ্যোগের আহবান

আহম্মদ কবির,তাহিরপুর প্রতিনিধি: নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল বাংলাদেশের অন্যতম জলাভুমি ও দ্বিতীয় রামসার সাইট খ্যাত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম “টাঙ্গুয়ার হাওর” প্রতি বছরের ন্যায়,চলতি বছরেও শীতের শুরুতেই সুদূর সাইবেরিয়া নেপাল মঙ্গলিয়াসহ পৃথিবীর ভিবিন্ন দেশ হতে হাজারো মাইল পাড়ি দিয়ে দেশের ছোট বড় কয়েকটি হাওরে ক্ষনস্থায়ি বসবাস গড়ে তোলে অতিথি পাখিরা। তার মধ্যে টাংগুয়ার হাওর অন্যতম, কিন্তু এ বছর পাখির কিচির মিচির শব্দহীনতায় দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাংগুয়ার হাওর। শীতের শুরুতেই টাংগুয়ার হাওরে আসে লেনজাহাঁস, পিং হাঁস, বালি হাঁস, কাইম, গংগা কবুতর, কালাকূড়া,মৌলবীহাঁস,পিয়ারিসহ বিভিন্ন প্রজাতের অতিথি পাখি।

কিন্তু বর্তমান বছরে টাংগুয়ার হাওরে অতিথি পাখির আগমন অন্য বছরের তুলনায় অনেকটাই কম।

এলাকবাসীর সুত্রে জানা যায়, টাংগুয়ার হাওরে অতীতের ন্যায় এ বছরেও অতিথি পাখি নিধনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এক শ্রেনীর অসাধু চক্র,যা ইতি মধ্যে এসেছে তা চুরি করে শিকার করে বিক্রি করার পায়তারা চলছে।

আই,ইউ,সি,এন এর বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়া হাওরকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারী ইরানের রামসা নমক অঞ্চলে জলাভুমি শনাক্ত বিষয়ক সভায় টাংগুয়ার হাওর কে রামসার এলাকা হিসাবে অন্তর ভুক্ত করা হয়। ২০০৩ সালের নভেম্বর থেকে ইজারা প্রথা বাতিল করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হাওরের জীব বৈচিত্র রক্ষা ও রামসার নীতি বাস্তবায়ন লক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ১৮ বছর এই ব্যাবস্থাপনা পরিচালনায় শুরুতে কিছু সফলতা ছিল, কিন্তু বর্তমান আছে শুধু কাগজে কলমে বাস্তবে সফলতা নেই বললেই চলে।

একাকাবাসীর তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, শুরুতেই প্রকল্পে কিছু অবিজ্ঞ কর্মী ছিলেন,যাদের নির্লশ পরিশ্রমে ফলেই হাওরের সফলতা এসেছিল। এই সফলতা কিছুদিন ঠিকিয়ে রাখা সক্ষম হয়েছে।

টাংগুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলাপ্রশাসনের দায়িত্বে আসার পর আন্তরজাতিক সংগঠন আই,ইউ,সি,এস,এর সুত্রে জানা যায়, টাঙ্গুয়া হাওরে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ২১৯ প্রজাতির পাখি ছিল। পৃথিবীর বিলুপ্তপ্রায় প্যালাসাস ঈগল পাখি টাংগুয়ার হাওরে আছে। কালেম, পানকৌড়ি, ভূতিহাঁস, পিয়ংহাঁস, খয়রাবগা, লেঞ্জাহাঁস, নেউপিপি, সরালি, রাজসরালি, চখাচখি, পাতি মাছরাঙা, পাকড়া মাছরাঙা, মরিচা ভূতিহাঁস, সাধারণ ভূতিহাঁস, শোভেলার, লালশির, নীলশির, পাতিহাঁস, ডাহুক, বেগুনি কালেম, গাঙচিল, শঙ্খচিল, বালিহাঁস, ডুবুরি, বক, সারসসহ ভিবিন্ন প্রজাতির পাখি তৎকালিন হিসাব অনুযায়ী টাংগুয়ার হাওরে প্রায় ২১৯ প্রজাতি দেশী বিদেশী পাখি থাকার কথা।

কিন্তু ২০১১ সালের আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন আই,ইউ,সি,এন, এর এক জরিপে টাঙ্গুয়ার হাওরে ৬৪ হাজার পাখির বসবাস আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ৮৬ জাতের দেশি এবং ৮৩ জাতের বিদেশি মোট ১৬৯ প্রজাতের পাখির কথা উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা হতে প্রকৃতির টানে টাঙ্গুয়া হাওর দেখতে আসা একাদিক পর্যটক গনের সাথে কথা বলে উনারা জানান, গত কয়েক বছর আগে টাঙ্গুয়া হাওরে ঘুরতে এসেছিলাম সে সময়ে যে পরিমাণ অতিথি পাখি দেখেছিলাম বর্তমানে তা আর দেখা যাচ্ছে না, টাংগুয়ার হাওরটা কেন জানি অচেনা অচেনা লাগছে।

টাঙ্গুয়া হাওর সহব্যাস্থাপনা সোসাইটির ২নং দক্ষিন বংশিকুন্ডা ইউনিয়ন কমিটির কোষাধ্যক্ষ গোলেনুর মিয়া বলেন,টাংগুয়ার হাওর প্রকৃতিক সম্পদ সংরপক্ষন করার জন্য সুনামগঞ্জ জেলাপ্রশাসন হতে একজন ম্যাজট্রেট এর নেতৃত্বে আনসার, পুলিশ ও কমিউনিটি গার্ডের সদস্যরা সার্বক্ষনিক কাজ করছে,কিন্তু টাংগুয়ার হাওর রক্ষকরাই ভক্ষক,ম্যাজিষ্টেট এর চক্ষু ফাকি দিয়ে অবৈধ মৎস্য ও পাখি শিকারীদের কাজ হতে প্রয়োজনীয় নজরানা নিয়ে নিজের পকেট ভারী করছেন টাংগুয়ার হাওর সংরক্ষনে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা ব্যাক্তিরা।

এ ব্যাপারে টাংগুয়ার হাওর কমিউনিটি গার্ড সুপার ভাইজার মিরাজ আলীর বিরুদ্ধে প্রমানসহ কমিউনিটির নেতাদের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে কিন্তু নেতারা অভিযোগটি আমলে নেননী। তাই মিরাজ বর্তমানেও অবৈধ কোনাজাল কারেন্টজালসহ বিভিন্ন অবৈধ মৎস্য আহরনকারীদের মৎস্য আহরনের সুযোগ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোঠা অংকের টাকা।

টাংগুয়ার হাওর সমাজ ভিত্তিক সহব্যাবস্থাপনা সোসাইটির,সাবেককেন্দ্রিয় কমিটির কৃষি সম্পাদক ও ইক্যু ট্যুরিষ্ট গাইড অকিল তালুকদার বলেন, এ বছর অতিথি পাখি অন্য বছরের তুলনায় কম আসার কারন, হাওরে পাখির অভয়াশ্রমগুলো অরক্ষিত, যেখানে প্রতিদিন আনসার,কমিউনিটি গার্ড ও নৌকার মাঝিরা অবৈধ মৎস্য আহরনকারীদের কাছ হতে নজরানা নিয়ে মৎস্য আহরনের সুযোগ দিচ্ছে। যাথেকরে পাখিদের নিরাপত্যার গাঠতি হচ্ছে। যার ফলেই টাংগুয়ার হাওর হতে অতিথি পাখিরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ইতিমধ্যে পাখি যাই আসছে তা নিধন করার জন্য আনসার, মাঝি,ও কমিউনিটি গার্ডের সাথে পাখি শিকারীদের যোগসুত্র চলছে।

টাংগুয়ার হাওর দায়িত্বরত এক্সিকিউটিব ম্যাজিষ্ট্রেট এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে উনার মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করার সম্ভব হয়নি।

টাংগুয়ার হাওরে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত পাখির আবাসস্থল গুলো সঠিক নিরাপত্যা ও কার্যকরী কোন উদ্যোগ নিতে না পারায়, বিশাল এই জলরাসি হতে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে অতিথি পাখিরা। এ ব্যপারে সঠিক নিরাপত্যা ও কার্যকরী উদ্যোগ নিতে উর্দতন কর্তৃপক্ষের সু-দৃষ্টি কামনা করছেন পাখি বিশেষজ্ঞ ও স্থানিয় সুশীল সমাজ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:-