টাংগুয়ার হাওরে পানি কমতে শুরু হওয়ায় বেপরোয়া অবৈধ মৎস্য শিকারীরা

তাহিরপুর প্রতিনিধিঃ দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট মা মাছের অভয়ারণ্যে টাংগুয়ার হাওর পানি কমতে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অবৈধ মৎস্য শিকারীরা। হাওরে অবৈধভাবে চৌহন্দা/পারাজাল , কারন্টে জাল,কুচ ন্যাটজালে বাধ দিয়ে ছাই দিয়ে মাছ নিধনের মহোৎসব শুরু হয়েছে। প্রতিদিন চলছে মাছ নিধন। তবে এখন ভোর হলেই হাওরে চৌহন্দা জাল দিয়ে মাছ নিধনের মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুন। রাতের বেলাও কমতি নেই টর্সলাইটের আলোয় কুচ দিয়ে টাংগুয়ার হাওরের রৌহা বিল,রোপাবুই বিল,লেইচ্যামারাবিল,
চটানিয়াবিল,সহ কয়েকটি বিল,অবৈধ মৎস্য শিকারীরা স্বারারাত মাছ ধরে এবং এসব মাছ বিক্রির জন্য ভোররাতেই বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে জানা যায় টাংগুয়ার হাওরের বিভিন্ন বিলে প্রতিদিন ১৫ হইতে ২০টি চৌহন্দাজাল দিয়ে অবৈধভাবে মৎস্য নিধন করছে প্রতিটা জালে প্রতিদিন প্রায় ২০ হইতে ২৫ হাজার টাকার মাছ ধরছে,এছাড়াও কুচ ন্যাটজাল ধারা বাধ দিয়ে প্রতিদিন কয়েক লক্ষটাকার মাছ অবৈধভাবে নিধন হচ্ছে।দেশের প্রধান একাধিক ‘মাদার ফিশারিজ’র মধ্যে টাংগুয়ার হাওর অন্যতম। বিভিন্ন আকারের প্রায় ৫২টি সংযুক্ত বিলের সমন্বয়ে গঠিত এই হাওরের আয়তন ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর। মিঠা পানির মাছের অন্যতম বড় উৎস এই টাংগুয়ার হাওর ।চলতি বছর স্থানীয় মৎস্যজীবি সদস্যদের মধ্যে ছোটকাট বিল গুলোতে সরকার অনুমোদিত পারমিট দিয়ে মাছ ধরার অনুমোদিত না থাকায়, অবৈধভাবে মাছ ধরার উৎপাত বেড়েই চলছে। অবৈধ মৎস্য শিকার ও মাছের উৎপাদন ধরে রাখা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অবৈধ মাছ শিকারীদের কারণে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না মাছ মারার কার্যক্রম।

স্থানীয় কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের তথ্য মতে,টাংগুয়ার হাওরের ৫টি মাছের অভয়ারণ্যে মাছ ধরা সম্পুর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা মানছে না জেলেরা। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে জাল জব্দ করে নষ্ট করা হচ্ছে তবুও তারা থামছেন না। গতকাল( ১০ই,জানুয়ারী) বৃহস্পতিবার দুপুরে টাংগুয়ার হাওর কমিউনিটি গার্ডদের সহযোগিতায় টাংগুয়ার হাওর দায়িত্বরত এক্সিউটিব ম্যাজিস্ট্রেট এর বিশেষ অভিযানে দেড়লক্ষাধিক লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের অবৈধ্য জাল ও ৪টি মাছ ধরার ছোট নৌকা জব্দ করে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও থামছে না মাছ ধরা। টাংগুয়ার হাওর দেশের অন্যতম প্রধান মাছের উৎস স্থল হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। এ হাওরের মাছ খুব সুস্বাদু। এতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালো বাউস, আইড়, বোয়াল, শোল, গজার, ঘনিয়া ও ছোট প্রজাতির কই, মাগুর, পাবদা, সিং, পুটি, টেংরা, ভেড়া, মলা, বাঁচা মাছসহ সব প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এককালে ইলিশও পাওয়া যেত। এক কথায় এমন কোনো প্রজাতির মাছ ছিল না, যা হাওরে পাওয়া যেত না। অনেক প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন- পাঙ্গাস, বাছা গারোয়া, বাঘআইড়,নানিদ,স্বপুটি,পাবদা, রানি,সহ আরও অনেক মাছ।

সরেজমিনে দেখা গেছে রাতেরবেলা টাংগুয়ার হাওরের আলমের দোয়ারে ১হাজার ফুট লম্বা একেকটি জালে ছোট মাছ থেকে শুরু করে সবধরনের বড় মাছ ধরছেন মাছ শিকারীরা। ১০-১৫ জন লোক সংঘবদ্ধ হয়ে টানছেন বেড়জাল। এবং দিনের বেলা একেকটি চৌহন্দা জালে ৮-১০জন লোক সংঘবদ্ধ হয়ে দেদারসে মাছ ধরছে।
স্থনীয় সূত্রে জানা যায়, টাংগুয়ার হাওরের তীরে কয়কেটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। যাদের কাছে রয়েছে হাজার ফুটের উপরে দীর্ঘ এককেটি বেড়জাল। এসব বেড়জাল দিয়ে বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলে মাছ শিকার। বড় ধরনের একেকটি বেড়জাল টানতে ১০-১৫ জন জেলে লাগে। এসব বেড়জালের কারণে হাওরে মাছের বসতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। জালের আঘাতে হাওরে জলজ উদ্ভিদ কিংবা শেওলা জন্ম নিতে পারে না। স্থানীয়দের তথ্যমতে জানা যায় টাংগুয়ার হাওরের অবৈধভাবে মৎস্য শিকারের জন্য,প্রতিটি চৌহন্দা জাল সকাল ১টা হইতে ৩টা পর্যন্ত সময়ের জন্য ১হাজার টাকা এবং প্রতিটি কোণাজাল প্রতি রাতের জন্য ৫শত টাকা এছাড়াও কুচ শিকারীকে প্রতি রাতের জন্য ২শত টাকা করে দিতে হয়,টাংগুয়ার হাওর জীববৈচিত্র সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা আনসার, নৌকার মাঝিদের কে অবধৈভাবে শিকার করা এসব মাছ ইঞ্জিল চালিত নৌকায় দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে যান বিক্রেতারা।এসব নৌকা থেকে মাসোহারা পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

টাংগুয়ার হাওর ঘিরে প্রায় ৮৮টি গ্রামের ৫৬ হাজার মানুষ জীবন-যাপন করছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন টাংগুয়ার মাছ শিকার করে।

জেলেদের কাছে মাছ ধরার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন , আমাদের বিকল্প কর্মের ব্যবস্থা থাকলে আমরা মাছ ধরতাম না, বিকল্প চিন্তা করতাম।